কুঁড়েঘরের ছোট্ট জানালার ফাঁক গলে বাইরে তাকিয়ে আছে সাংবাদিক হাশেম। টেবিলে খাতা ও কলম।
যুদ্ধ চলছে, ছয় মাস হয়ে গেল। চারিদিকে ধোঁয়ার পুঞ্জ, দেওয়ালে দেওয়ালে আঘাতের চিহ্ন, পথের জঠরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ—করুণ, বীভৎস চিত্র।
যুদ্ধের খবরাখবর জোগাড় করতে হাশেমকে প্রায়শই বাইরে যেতে হয়। আজকেও যেতে হবে। তবে ফিরতে হবে আগামীকাল বিকেলে। এজন্য মা-বোনদের একা রেখে যেতে সাহসে কুলোচ্ছে না। বাবা অর্ধপাগল।
ছোট বোনকে গলা উঁচিয়ে ডাকল হাশেম—পারুল, এদিকে আয়।
ছুটে এলো আট বছরের পারুল। দুই পাশের দুই বিনুনি ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।
হাশেম বলল, মা ছাগল নিয়ে গেছে। ফিরলে বলিস, আমার কাজ আছে তাই চলে যাচ্ছি। ফিরব কাল।
—আমরা একা থাকব?
বোনের গালে হাত রেখে বলল হাশেম—তুই চিন্তা করিস না। সৈকত ভাইকে থাকতে বলে যাব।
সৈকত হাশেমের ফুফাতো ভাই। পাশের গ্রামেই থাকে। ভালো মানুষ। সময়ে, অসময়ে পাশে থেকেছে।
রাতে মাজেদা তাঁর দুই মেয়ে ও সৈকতসহ খেতে বসেছেন। এক লোকমা ভাত মুখে পুরতে যাবেন এমন সময় সদর দরজায় আঘাত। আঘাতের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে মাজেদা উঠতে না উঠতেই দরজা ভেঙে চৌচির। আঁতকে উঠল সবাই।
আওয়াজ এলো, কী রে সৈকত? একাই দুটোকে নিবি?
চেয়ারম্যানের ছেলে মুত্তালিব এসেছে। মুখে মিচকে হাসি। তার পেছন পেছন ঘরে ঢুকল সুঠাম দেহের তিন পাকসৈন্য। তাদের দেখে বুকে ধড়ফড় শুরু হলো মাজেদার। দুই মেয়েকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালালেন তিনি।
সৈকত হাত ধুয়ে উঠে পড়ল। মিচকে হাসি হেসে বলল, ‘নিতে আর পারলাম কই? চেষ্টা তো অনেক আগে থেকেই করছি।’
‘নিবি, নিবি। আজ নিবি।’
তারা কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছে তা ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও নারী হিসেবে মাজেদা এতটুকু বুঝলেন, আজ তাদের নিস্তার নেই। এক নোংরা পাশবিকতার বলি হতে চলেছেন তাঁরা। হলোও তাই। সৈকতও সঙ্গ দিল তাদের। পাঁচ পুরুষের অত্যাচারে রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল মেয়েদের আর্তচিত্কার। নৃশংসতার শেষ পর্যায়ে মাজেদাও ছাড়া পেলেন না।
সৈকত বলল, ‘ওদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। পরে আমার সমস্যা হবে।’
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তিন মা-মেয়ের বুকে এসে বুলেট বিঁধল।
পরদিন বিকেলে বাড়িতে ফিরল হাশেম। বাড়ি ভরতি লোকদের মাঝে সাঁতরে ঢোকার মতো ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকতে হলো তার। আঙিনার মাঝে সাদা কাফনে ঢাকা তিনটা লাশ দেখে আঁতকে উঠল সে। বুক ভেঙে কান্না এলো। এতদিন পাকবাহিনীর পাশবিক চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গ্রামে, শহরে ঘুরেছে সে। আজ মা-বোনদের নিয়ে সেই চিত্র ফুটিয়ে তুলতে হবে ভেবে হাশেম ভেতরে ভেতরে মরে যেতে লাগল। কী করে লিখবে সে?
সৈকত এসে হাশেমের কাঁধে হাত রাখল। বলল, ‘অনেক চেষ্টা করছি ওদের বাঁচানোর। পারি নাই রে।’
কিছুই বলল না হাশেম। ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে থাকল। হাশেম শুধু জানল পাকবাহিনীর নৃশংসতা। কিন্তু সেই নৃশংসতার শামিল ও সহায়ক এই সৈকত ও মুত্তালিবের কথা হাশেমের জানা হলো না।
মুক্তিযুদ্ধে অযুত-লক্ষ নারীর সম্ভ্রম হারানোর কথা লেখা আছে। কিন্তু সৈকত-মুত্তালিবদের মতো যাদের সাহায্য ব্যতীত পাকবাহিনী কখনো এমন নৃশংসতা চালাতে পারত না—তাদের কথা কোথায় লেখা আছে?
[দিনাজপুর]