দুই ব্যাংকে পর্যবেক্ষকেরা কী পারবেন?

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২২, ২২:১৮

ঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের মুখে ইসলামী ব্যাংকসহ দুইটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকে আগেও পর্যবেক্ষক ছিল। তবে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নয়, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা দরকার।

ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেও একই সঙ্গে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক আবুল কালামকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহকে। তারা সোমবার থেকে কাজ শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক যা বলছে:

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক জানান, ‘এই দুইটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তারা ঋণ দেওয়ায় নিয়ম মানেনি। গ্রাহকেরা আমানতের টাকা তুলে নিচ্ছিলেন। ব্যাংক দুইটিকে নিয়মের মধ্যে রাখা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘পর্যবেক্ষকেরা পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত থেকে সভায় ব্যাংকের স্বার্থ পরিপন্থী কিছু হলে তারা মতামত দেবেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কী না এ বিষয়ে তারা প্রতিবেদন দেবেন।’

তিনি বলেন, ‘এর বাইরে নানা গুজবে ব্যাংকগুলো চাপে আছে। তাই আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক যতদিন মনে করবে ততদিন ওই দুইটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষকেরা কাজ করবেন।

ছবি: ডয়চে ভেলে

ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের ঘটনা এই প্রথম নয়। ১৯৯৪ সাল থেকে এই ব্যবস্থা চলে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন প্রয়োজন মনে করে তখন ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে বলে জানান তিনি।

পর্যবেক্ষক যে কারণে:

ইসলামী ব্যাংক থেকে নভেম্বর মাসে নাবিল গ্রুপ ও মার্টস বিজনেস লাইন নামে দুইটি ভুয়া কোম্পানি খুলে দুই হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে দুই হাজার ৩২০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তারা ঋণ নিয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদনে জানা যায়, এস আলম গ্রুপ একাই ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। তাদের ঋণ পাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা হলো ২১৫ কোটি টাকা। নিয়ম না মেনে তাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাদের নিয়ন্ত্রণে মোট আটটি ব্যাংক।

পর্যবেক্ষক নিয়োগ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ব্যাংককে তারল্য সহায়তার অংশ হিসেবে ৭ ডিসেম্বর চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় ১৪ দিনের জন্য। তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও আছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

ঋণ দেওয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গ্রাহকেরা আমানত তুলে নেওয়ায় ওই ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট হওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটির অধীনে তাদের ওই স্বল্পমেয়াদী ঋণ দেয়।

এর আগেও ইসলামী ব্যাংকে অনিয়ম ও জঙ্গি অর্থায়নের আশঙ্কায় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলো বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে, এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ নেয়। আর ২০২০ সালের মার্চে পর্যবেক্ষক সরিয়ে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পর্যবেক্ষক কতটা কাজে আসবে?

যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে সাতটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পর ওই ব্যাংকগুলো দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠে। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিলো রাজনৈতিক প্রভাব, জঙ্গি অর্থায়ন এই বিষয়গুলো দেখতে। সেরকম কিছু না পেয়ে হয়তো পর্যবেক্ষক প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু নতুন পরিচালনা পর্ষদ আসার পর তারা কী করেছে তা তো বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেনি। এখন সেটা বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক  নিয়োগ না করলেও কোন ব্যাংক কী করছে সেটা দেখার ক্ষমতা ও দায়িত্ব তাদের। তারা তো দেখেনি।’

বাংলাদেশ ব্যাংক।

তার কথা, ‘পর্যবেক্ষকও সঠিকভাবে কাজ নাও করতে করতে পারে। তাকে ঠিকমত কাজ করতে দেয়া নাও হতে পারে। গত বছরও আমরা দেখেছি একজন পর্যবেক্ষক কাজ করতে না পেরে পদত্যাগ করে চলে গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক আরেকজন বসিয়ে দিয়েছে। তাই আসল কথা হলো বাংলাদেশ ব্যাংককে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

প্রশাসক নিয়োগ করা উচিত ছিল:

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান  ও পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ছোটখাটো ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করলে হয়তো কাজ হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি মনিটর করতে পারে। কোনো অনিয়ম হলে তারা তা সরাসরি দেখতে পারে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের মত বড় এবং প্রভাবশালীদের ব্যাংকে পর্যবেক্ষক কী করবেন! অনেকেরই সুপারিশ ছিল ইসলামী ব্যাংকসহ একই শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ করা। তাহলে তার স্বাক্ষর ছাড়া কিছু হতো না। কিন্তু তা তো করা হলো না। অনেক নরম ব্যবস্থা নেওয়া হলো।’

তার কথা, ‘আমরা এর আগেও তো দেখেছি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে কাজ হয়নি। তারা কাজ করতে পারেনি। একটি ব্যাংকের প্রভাবশালী ১৫ জন পরিচালক আর ১০ কর্মকর্তার সামনে পর্যবেক্ষক কি করবেন? তবে প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হলে আলাদা কথা।’

পাঁচ ব্যাংকে সমন্বয়ক:

পর্যবেক্ষক ছাড়াও বাংলাদেশের পাঁচটি ব্যাংকে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা সমন্বয়ক কাজ করছেন। এগুলো হলো, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। আরও পাঁচটি ব্যাংককে দুর্বল বলে চিহ্নিত করে ওইসব ব্যাংকও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে মঙ্গলবার হাইকোর্ট ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য রণ হক সিকদার ও তার পরিবারবর্গের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম