সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা বঞ্চিত

উচ্চ শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৪:৫৬

সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা কোটা পদ্ধতিতে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও সরকারি চাকরির সুবিধা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। সরকার পিছিয়ে পড়া নৃগোষ্ঠীদের সুবিধার্থে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি চাকরির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দেওয়া কোটার মাত্র ১৯ শতাংশ সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সুযোগ পায়। আর সিংহভাগ ৮১ শতাংশ কোটা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পাচ্ছে। এই ৮১ শতাংশের মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রায় ৭১ শতাংশ চাকরির সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। পার্বত্যাঞ্চলের কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর একচ্ছত্রভাবে কোটা সুবিধা পাওয়ার কারণে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে। কোটা ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালি সম্প্রদায়ের লোকজন একেবারে অবহেলিত। এতে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পার্বত্য বাঙালিদের মধ্যে বাড়ছে  ক্ষোভ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ি, দেশে মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার। যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ। এদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে ৯ লাখ ২০ হাজার এবং সমতলে বসবাস করেন ৭ লাখ ৩০ হাজার। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫৬ শতাংশ এবং সমতলে ৪৪ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারি ১৮ লাখ ৪২ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে বাঙালি সম্প্রদায়ের সংখ্যা অর্ধেক। চাকমা ২৫ শতাংশ (৪ লাখ ৬৬ হাজার), মারমা সাড়ে ১১ শতাংশ (২ লাখ ১৩ হাজার), ত্রিপুরা ৬ শতাংশ (১ লাখ ১৪ হাজার), ম্রো ২.৮ শতাংশ (৫২ হাজার), তঞ্চঙ্গ্যা ২.৫ শতাংশ (৪৬ হাজার) এবং অন্যান্য ২.৫ শতাংশ (২৭ হাজার)।

পার্বত্য তিন জেলায় পার্বত্য বাঙালিসহ ১৩ টি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করছে। তারা হল পার্বত্য বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি, চাক, লুসাই, রাখাইন এবং তঞ্চঙ্গ্যা। দেশের সমতল ভূমির মধ্যে রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠী বসবাস করে। সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সাঁওতাল, ওরাঁও, মুণ্ডা, মাহালি, পাহান, বর্মন, কোরা, মুশোর, গারো এবং হাজং। সর্বশেষ জনশুমারি-২০২২ অনুযায়ি, রংপুর বিভাগে ৯১ হাজার ৭০ জন, রাজশাহী বিভাগে ২ লক্ষ ২৪ হাজার ৫৯২ জন, সিলেট বিভাগে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৫৯৪ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। 

বিগত ১০ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংরক্ষিত ৩১০৮টি আসনের অর্ধেকের চেয়ে বেশি (শতকরা ৫৬ ভাগ) এককভাবে চাকমা শিক্ষার্থীরা অধিকার করেছে। যেখানে চাকমারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ২৯ ভাগ। মারমারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যার শতকরা ১৪ ভাগ এবং কোটা আসনের শতকরা ১৪ ভাগ, ত্রিপুরারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শতকরা ৯ ভাগ এবং কোটা আসনের শতকরা ৭ ভাগ আসনে ভর্তির সুযোগ গ্রহণ করেছে। সাঁওতালরা  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ৮ ভাগ হলেও শতকরা ৩ ভাগ এবং মনিপুরী, গারো, হাজংসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শতকরা ৩২ ভাগ হয়েও কোটার মাত্র শতকরা ২০ ভাগ সুবিধা লাভ করেছে।

রাঙামাটি জেলার পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি সাব্বির আহম্মদ এই প্রতিবেদককে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠী তিন পার্বত্য এলাকার  মোট জনগণের ৫০ শতাংশের বেশি হলেও উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও সরকারি চাকরির সুবিধার ক্ষেত্রে তারা অবহেলিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায়ের জন্য সরকারের কাছে বিশেষ ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি। কারণ আমরা দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। পার্বত্য বাঙালিদের শিক্ষার হার মাত্র ২৩ শতাংশ; বাংলাদেশের যেকোনো জেলা হতে অনেক কম। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘দেশে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির কারণে আমরা উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও সরকারি চাকরির সুবিধা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছি।’

তিনি বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সমান বণ্টনের দাবি জানান। আলাপ প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, সমতল ভূমির জাতিগত সম্প্রদায়গুলি রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা প্রতিনিধিত্বহীন এবং উপেক্ষিতবোধ করে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি অনুযায়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, স্বায়ত্ত্বশাসিত বা আধা-স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্পোরেশনের তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী চাকরির অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যা সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন পাচ্ছে না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গারো সম্প্রদায়ের এক নেতা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে  জেএসএস শান্তি চুক্তির পরেও জুম্মল্যান্ড গঠনের লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি সন্তু লারমার দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দাবি বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই বিষয়টি আমাদের সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দকে বুঝতে হবে এবং সরকারের নিকট পৃথকভাবে আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে হবে। 

তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী পার্বত্য বাঙালি দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হয়েও দেশে কোটা পদ্ধতিতে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও সরকারি চাকরির সুবিধার ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের সেবায় পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশকে মূলধারার সঙ্গে এগিয়ে নিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত ছিল। তবে ২০১৮ সালে ঢাকার শাহবাগে কোটা বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার পাবলিক সার্ভিস কমিশনে প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির কোটা পদ্ধতি বাতিল করে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বলবৎ রাখা হয়। তবে পার্বত্য তিন জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে জাতিগত সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীরা এখনও মাঝে মধ্যে কোটা বিলুপ্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করছে।রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য রেমলিয়ান পাংখোয়া ইত্তেফাককে বলেন, পাংখোয়া শুধু জাতিগত সংখ্যালঘু নয়, এই জাতি বিলুপ্তপ্রায়। আমরা দেশে কোটা পদ্ধতিতে উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি ও চাকরির সুবিধা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ ইত্তেফাককে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কোটা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। একটি বা দুটি গোষ্ঠী কোটা সুবিধার সিংহভাগ পাচ্ছে আর অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। এতে নতুন অসন্তোষ ও বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ভাল-মন্দ দিকগুলো খতিয়ে দেখে পরিবর্তন করা দরকার। এক্ষেত্রে পার্বত্যাঞ্চলে চরমভাবে অবহেলিত, পশ্চাৎপদ ও বঞ্চিত পার্বত্য বাঙালিদেরও কোটার আওতায় আনা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/কেকে