লবণাক্ত মোংলায় সবজি চাষ ও পশুপালনে নতুন আশা

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:০৮

মাটিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় মোংলায় যখন ফসল চাষ ও গবাদি পশু পালন প্রায় উঠেই গিয়েছিল, এখন সেখানেই মৌসুমি শাকসবজি ও ছাগল-ভেড়া পালন করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন শতাধিক নারী। এ নারীরা তাদের পরিবারের শাকসবজি ও দুধ-মাংসের চাহিদা মিটিয়েও এসব বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন। আর এসব সম্ভব হয়েছে উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ফ্রেন্ডশিপের সহায়তায়। তাই ফ্রেন্ডশিপের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই সুবিধাভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের।

উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানায়, উপকূলীয় জনপদ মোংলায় একসময় প্রচুর ফসলের চাষাবাদ হতো। প্রতি বাড়িতেই গরু, ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদি পশু পালন করা হতো, বাড়ির উঠানে হতো ধানসহ মৌসুমি ফসলের চাষাবাদ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাওয়ায় চাষাবাদ বিঘ্নিত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে ধীরে ধীরে মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় বন্ধ হয়ে যায় গবাদি পশু পালন ও ফসলের চাষ। এখন আর আগের মতো মাঠে নেই ধান, বাড়ির আঙিনায় নেই সবজিখেত, গোয়ালে নেই গরু, ছাগল-ভেড়া। একপর্যায়ে এলাকার মানুষের দুর্বিষহ জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে মাঠে নামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। উপজেলার সোনাইলতলা ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ উলুবুনিয়াসহ কয়েকটি গ্রামে তারা লবণসহিষ্ণু উন্নত জাতের ফসলের বীজ ও ছাগল-ভেড়া পালনের উপকরণ প্রদান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে গৃহিণীদের সহায়তা করে। সেই সঙ্গে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ এই গৃহিণীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এই সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেয়ে একটা সময়ে লবণসহিষ্ণু শাকসবজি চাষ ও ছাগল-ভেড়া পালনে এই গৃহিণীরা দারুণ সাফল্য অর্জন করেন। উপজেলার সোনাইলতলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ১২০টি নারী পরিবার এখন মৌসুমি সবজি চাষে ও ছাগল-ভেড়া পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কোনো ধরনের কীটনাশক ছাড়াই জৈব সার দিয়ে তারা শীতকালীন ও বর্ষাকালীন সবজি চাষ এবং সারা বছর ধরে গবাদি পশু পালন করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। তাদের এই সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন আশপাশের নারীরাও।

উলুবুনিয়া গ্রামের সুবিধাভোগী মুক্তি রায় ও নওরোজ সুলতানা বলেন, ‘আমরা ফ্রেন্ডশিপ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং ১৫-১৬ প্রকার সবজিবীজ পেয়ে বাড়ির পতিত জমিতে সেগুলো বপন করি। উত্পাদিত সবজি দিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে গত বর্ষা মৌসুমে ১০-১২ হাজার টাকা বাড়তি আয় করেছি। আর চলতি শীত মৌসুমের সবজি দিয়েও ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারব। আগের চেয়ে আমরা এখন অনেক ভালো আছি সবজি চাষ করে।’ তাদের উত্পাদিত ১৬ প্রকার সবজির মধ্যে রয়েছে লেটুস পাতাও। লবণাক্ত এলাকায় লেটুস পাতার চাষ করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তারা। সেই লেটুস পাতার খেত দেখতে প্রতিদিন আশপাশের নারীরাও আসছেন। মুক্তি রায় ও নওরোজ সুলতানা তাদের উদ্বৃত্ত বীজ দিয়ে দিচ্ছেন প্রতিবেশী নারীদেরও। তারাও এখন সবজি চাষে ঝুঁকে পড়ছেন।

সোনাইলতলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. নওশের শেখ বলেন, ফ্রেন্ডশিপের এএসডি প্রকল্প এই এলাকায় দুই বছর ধরে কাজ করছে। তাদের মাধ্যমে এখানকার নারীরা কৃষি ও পশু পালনে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। তারা এখন সবজি ও ছাগল-ভেড়া পালনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন।  ফ্রেন্ডশিপের এএসডি প্রকল্পের প্রজেক্ট অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন ও এএসডি প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘আমরা এই এলাকায় বছরে দুই বার—বর্ষা ও শীতকালে ১৫/১৬ প্রকার বীজ সরবরাহ করে থাকি। সেই বীজ দিয়ে নারীরা কীটনাশকমুক্ত জৈব সার দিয়ে সবজি চাষাবাদ করছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাগল-ভেড়া লালন-পালন করছেন। বসতবাড়ির পতিত জমিতে সবজি চাষ ও ছাগল-ভেড়া পালন করে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। এ এলাকায় সবজি ও ছাগল-ভেড়া পালনে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। অন্য নারীরাও এতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন ও উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ইউনুস আলী বলেন, ‘ফ্রেন্ডশিপের উপকরণাদির সদ্ব্যবহারে সুবিধাভোগীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলার পর তারা এখন সবজি ও পশু পালনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। লবণাক্ত এলাকায় বিকল্প পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন নারীরা। আগ্রহী অন্য নারীদেরও আমরা প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত আছি।’

ইত্তেফাক/ইআ