মুসলিম বিশ্বের নারী মানেই যেন রাকঢাক। কাতার মুসলিম দেশ। সেখানকার নারীদের সম্পর্কে আগে যতটা ধারণা ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পূর্ব ধারণা বদলে গেছে। নারীরা বোরকা পড়ে চলাফেরা করেন। আধুনিক বোরকা। নানা ডিজাইনের আকর্ষণীয় বোরকা ব্যবহার করেন। ধর্মীয় অনুশাসনেরই একটা অঙ্গ বোরকা। কাতারের নিয়ম হচ্ছে নারীরা বোরকা ছাড়া বের হতে পারবেন না। ধর্মীয় রীতি মেনে চলা সব শ্রেণি কাতারি নারীরা অঙ্গ সজ্জায় খুব সচতেন। ফ্যাশন সচেতন।
কাতারের নারীদের বোরকার নিচে পাশ্চাত্যের ছোঁয়া। পরনে থাকে জিন্সপ্যান্ট, গেঞ্জি, পায়ে কেডস, হাতে দামি ঘড়ি, স্বর্ণালঙ্কার। কাতারি নারীরা অঙ্গসজ্জায় ভীষণ খুঁতখুঁতে। যত্নের শেষ নেই। আধুনিকতার আলোয় ভরে থাকে তাদের দেহমন। কাতারি নারীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক রয়েছে। ঐতিহ্য মেনে সেই পোশাকের ব্যবহার এখন আর নেই। চার দশক আগে ভারত থেকে কাতারে আসা একজন ভারতীয় বললেন, ‘কাতারের নিজস্ব পোশাক রয়েছে। সেটি এখন আর ব্যবহার করা হয় না। সবাই আধুনিকতার প্রতি মন দিয়েছেন। বছর বিশেক আগেও এমনটি ছিল না। ঐতিহ্যবাহী নারী পোশাক থাকলেও এখন সব শ্রেণির কাতারিরা আধুনিক পোশাকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। এখন কাতারের নারীরা ইউরোপ আমেরিকা ছাড়া কিছুই বুঝেন না। পশ্চিমা পোশাক, অলংকার ব্যবহার দিনে দিনে বেড়েই চলছে।’
যারা পাশ্চাত্য নারী দেখেছেন, তাদের সাজসজ্জা আর কাতারের নারীদের সাজসজ্জার মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান নেই। কাতারে আধুনিক পার্লার রয়েছে। সেখানে হলিউডের নামিদামি তারকাদের পছন্দের ব্র্যান্ডের মেকআপ রয়েছে। যেভাবে সাজতে চাইবেন সেভাবেই সাজিয়ে দেবে। বোরকা ব্যবহার হয় ঢেকে রাখার জন্য। ভেতরে পুরো শরীরে ইউরোপীয়ান পোশাক, অলংকারে সজ্জিত। বিশ্ব জুড়ে পোশাক শিল্পে যেসব ব্র্যান্ড দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে সেই ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র কাতারি নারীদের গায়ে।
শপিংমলে দামি বোরকার দোকানই আলাদা। দামও সেই রকম। লাখ লাখ টাকায় বোরকা কিনতে হয়। ৩-৪ লাখ টাকা দামের বোরকা কোনো ব্যাপারই না। কয়েক বার ব্যবহার করেই নতুন বোরকায় চোখ যায়। আধুনিক শপিংমলে ঘুরছেন নারী। নতুন কি এসেছে সেদিকে চোখ যায়। শপিংমলের বড় বড় দোকান ইউরোপীয়ান পোশাকে ছেয়ে আছে। দোকানে টপলেস জামাও পাওয়া যায়। হাঁটু পর্যন্ত সাইজের প্যান্ট বিক্রি হচ্ছে। শোরুমে ঢুকলে মনে হবে আপনি ইউরোপ কিংবা আমেরিকার কোনো শোরুমে ঢুকলেন। জানতে চাইলে দোকানি নারী এগিয়ে এসে আরবিতে যা বললেন তা তর্জমা করলে, ‘এগুলো সবই নারীদের পোশাক। আপনি ঐ দিকে যান পুরুষদের পোশাক রয়েছে।’ এসব কাপড় কাদের জন্য? সেলসের দায়িত্বে থাকা নারী বললেন, ‘কাতারের নারীরাই মূলত ক্রেতা।’
একজন টেইলার্সের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কাতারি নারীদের সৌখিনতার কথা। তারা নাকি বলিডউ তারকাদের চেয়েও দামি কসমেটিকস ব্যবহার করেন। বিশ্বমানের যেসব কসমেটিকস, সানগ্লাস রয়েছে নতুন বের হলেই সেটা কাতারি নারীদের ঘরে চলে আসে। সবচেয়ে আধুনিক মোবাইল ফোন বাজারে বের হওয়ার পরদিনই কাতারি নারীদের হাতের মুঠোয় চলে আসে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে দোহায় মেট্রো রেল স্থাপন করা হয়েছে। মাত্র তিনটা রুটে চলে ট্রেন। মেট্রোতে উঠলে খুব কমই দেখা যায় কাতারি নারী যাত্রী। পথেঘাটেও দেখা যায় না। নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ব্যবহার করেন তারা।
২৮ বছর ধরে কাতারে থাকছেন বাংলাদেশের ইকবাল হোসেন। তার কাছে জানা গেল কাতারি নারীরা বোরকায় মুখ ঢেকে রাখলেও ঠোঁট চোখ দেখিয়ে রাখেন। কেন? একটি বিশেষ ওষুধের মাধ্যমে মুখের চোয়াল ভেঙে রাখেন। এতে ঠোঁট সামনের দিকে উঁচু হয়ে থাকে। তাতে নাকি আকর্ষণ বাড়ে। পুরুষরা মুগ্ধ হয়।’ কাতারে বোরকা পরা আইন। তবে বোরকার নিচে নারীর পুরো শরীরটাই পাশ্চাত্যে সাজানো। নারীরা মনে প্রাণেও পাশ্চাত্যের আবহে ঘিরে থাকেন।
