জীবন যেখানে যেমন

গবাদি পশু পালনই বিস্তীর্ণ চরবাসীর প্রধান জীবিকা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:০০

জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদনদী বিধৌত কুড়িগ্রাম জেলার চার শতাধিক চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে গবাদি পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে চরবাসী। চরাঞ্চলে জন্মানো সবুজ লতাপাতা আর ঘাস সহজেই খাদ্য হিসেবে পাওয়ায় অল্প পুঁজিতে গরু-মহিষ পালন করে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তারা।

চরাঞ্চলের মানুষ গবাদি পশু পালন করেই বন্যা, খরা, নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে আছে। বালু জমিতে উৎপাদিত ফসলে পরিবারের চাহিদা মেটাতে না পারায় গবাদি পশু পালনেই ঝুঁকে পড়েছে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। এতে করে গরু বিক্রির বাড়তি আয়ে তাদের সংসার চলায় চরাঞ্চলসহ জেলায় বেড়েছে গরু-মহিষের সংখ্যা।

চরাঞ্চলগুলোর বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে খোলা আকাশের নিচে চরে বেড়াতে দেখা যায় গরু-মহিষের পাল। চরে জন্মানো ঘাস-পাতা এদের মূল খাদ্য হওয়ায় খরচও কম। পাশাপাশি তেমন যত্ন না নিলেও প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে ওঠে। চরের গরু-মহিষের দুধের চাহিদা অনেকটা বেশি থাকায় লাভবান হচ্ছে পালনকারীরা। অনেকে বাড়িতে নিজেরাই দুধ থেকে দই, মিষ্টি, ঘিসহ মুখরোচক খাবার তৈরি করে হাটে নিয়ে বিক্রি করে পরিবারের চাহিদা মেটাচ্ছে।

ভারতের সীমানা পেরিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার, জিঞ্জিরাম, হলহলিয়াসহ ছোট-বড় ১৬টি নদনদী অববাহিকার চার শতাধিক চরাঞ্চলে বসবাস করে লক্ষাধিক কৃষক পরিবারের প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। আর চরাঞ্চলের খোলা প্রান্তরে চরে বেড়ানোয় রোগব্যধি কম হওয়ায় দেশি জাতের গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া পালন করেই টিকে আছে চরবাসী।

কুড়িগ্রাম প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলায় ২০২০ সালে গরুর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩১ হাজার ৪৫২টিতে। এর মধ্যে দেশি জাতের গাভী ২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬টি, শংকর জাতের গাভী ৫০ হাজার ১২৪টি, দেশি জাতের বকনা ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৯৮টি, শংকর জাতের বকনা ৩৯ হাজার ৮৫৭টি, দেশি জাতের ষাঁড় ও বলদ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৩২টি, শংকর জাতের ষাঁড় ও বলদ ৫৫ হাজার ৩৯৬টি, দেশি জাতের বাছুর ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩৬টি, শংকর জাতের বাছুর ৩৫ হাজার ৭২৩টি। এছাড়া মহিষ রয়েছে ৯ হাজার ৫২৭টি, ছাগল ৬ লাখ ১২ হাজার ৬২টি এবং ভেড়া রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৩১টি।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার খেয়ার আলগার চর, রলাকাটা চরের প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবারের প্রত্যেকের বাড়িতেই  দুই-তিনটি থেকে শুরু করে ২০-২৫টি পর্যন্ত গরু-মহিষ রয়েছে। সেইসঙ্গে পালিত হচ্ছে ছাগল-ভেড়া।

খেয়ার আলগা চরের কৃষক সাজেদুল হক, শমশের আলীসহ অনেকে জানায়, চরের প্রতিটি বাড়িতে গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া রয়েছে। তারা গাভীর দুধ নিজেরা খাওয়ার পরও কিছুটা বাজারে বিক্রি করার পাশাপাশি এসব গরু-মহিষ দিয়ে জমিতে হালচাষও করেন। প্রতি বছর গবাদি পশু বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করার পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতা জয় করে নিজেদের উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন তারা। বন্যা বা নদীভাঙনের সময় পরিবারপরিজন নিয়ে টিকে থাকার জন্য গবাদি পশু বিক্রির টাকাই তাদের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে কাজ করে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও গঙ্গাধরসহ চারটি নদী প্রবাহিত। চরাঞ্চলগুলোতে স্বামী-সন্তান বাইরে কাজ করে আর বাড়িতে নারীরা গবাদি পশু পালন করে অনেক লাভবান হচ্ছেন। বর্তমানে তাদের আয়ের উৎস হচ্ছে গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া পালন। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে নির্বিঘ্নে মহিষের দল বিচরণ করতে পারায় তেমন একটা পরিচর্যা বা খাদ্য খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে গবাদিপশু। গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে চাহিদা বেশি থাকায় প্রায় সারা বছরই গরু-মহিষের দুধের মূল্য পায় চরবাসীরা।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মো. ইউনুছ আলী জানান, সরকারিভাবে জেলার কৃষকদের গরু পালনে উৎসাহিত করায় গরুর সংখ্যা বেড়েছে। চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে লাভজনক হওয়ায় প্রায় প্রত্যেকটি কৃষক পরিবার গরু-মহিষ পালন করেন। মহিষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় রোগবালাই কম হয়। তাছাড়া চরাঞ্চলসহ গ্রামের হাটবাজারগুলোতে চাহিদা বেশি থাকায় প্রায় সারা বছরই মহিষের মাংস ও দুধের মূল্য বেশি থাকে। তাই আমরা চরাঞ্চলে গবাদি পশু পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে থাকি।

ইত্তেফাক/এমএএম