শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হচ্ছে

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৩, ২২:০৪

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) নিয়মিত অপব্যবহার মত প্রকাশের ক্ষেত্রে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি করছে।

তারা বলছে, গত চার বছরে ওই আইনটি সংশোধনের কোনো অগ্রগতি নেই উল্টো আরও নতুন কিছু আইনের প্রস্তাব পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ডিএসএর অপব্যবহার আরও বাড়বে। বাকস্বাধীনতা আরও সংকুচিত হবে।

দুই হাজার ২৪৯টি মামলা:

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২২এ আটটি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ঢাকা এই তিনটি বিভাগেই জিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট মামলা হয়েছে দুই হাজার ২৪৯টি। আসক জানায়, অন্য বিভাগগুলোর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেও মামলার হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। সেই হিসাব পাওয়া গেলে মামলার সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। তারা বলছে চার বছর আগে প্রণীত এই আইন নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা ছিল। তারপর সরকারের পক্ষ থেকে সংশোধনের কথাও বলা হয়। কিন্তু সংশোধন না করে উল্টো অপব্যবহার বাড়ছে।

নতুন আইন উদ্বেগের:

অন্যদিকে নতুন দুইটি আইনের খসড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে মনে করে আসক। তারা বলছে, সরকার অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়ি করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আলাদা দুটি খসড়া নীতিমালায়, ‘দ্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন রেগুলেশন ফর ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড ওটিটি প্ল্যাটফর্মস ২০২১' এবং ‘ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা প্রদান এবং পরিচালনা নীতিমালা-২০২১-এর খসড়ার কিছু ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং ওটিটিসহ ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদনমূলক প্ল্যাটফর্মে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ আরও সংকুচিত হবে। এছাড়া ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২' শিরোনামে আরেকটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে যা সংবিধানের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ও তথ্য অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক।

সাংবাদিকদের ওপর প্রয়োগ:

বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ মানবাধিকার সংগঠন আর্টিক্যাল নাইনটিন-এর হিসেবে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২৫টি মামলা হয়েছে। আর এতে মোট আসামি করা হয়েছে ৬০ জনকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছয় জনকে। আর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে এ পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১০১টি। এতে আসামি করা হয়েছে ২০৬ জন সাংবাদিককে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৪ জনকে।

এইসব মামলার অধিকাংশই করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শাসক দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের লোকজন।

ছবি: ডয়চে ভলে

আর আসকের হিসাবে, গত বছর ২২৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। যাদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হয়েছেন ৭৯জন সংবাদকর্মী।

মানবাধিকারকর্মীরা যা বলছেন:

আসকের সাধারণ সম্পাদক এবং মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, ‘ডিএসএর মাত্র তিনটি বিভাগের তিনটি ট্রাইব্যুনালের যে হিসাব তাতে গত বছরে মামলা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আটটি ট্রাইব্যুনালের হিসাব আসল পরিমাণ তিনগুণের বেশি হবে। আমরা লক্ষ্য করছি এই মামলাগুলো করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য। এ থেকে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী কেউই রেহাই পাচ্ছে না।’

তার কথা, ‘মানুষ নানা বিষয় নিয়ে বিরক্ত, তারা কথা বলতে চায়। তাই নির্বাচনের আগে এই আইনটি অরও বেশি প্রয়োগ হবে বলে ধারণা করছি। আর এটা সরকারের দিক থেকে করা হবে। আরও যে নতুন তিনটি আইনের কথা হচ্ছে তারও উদ্দেশ্য একই।’

তার মতে, ‘সরকারি দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই আইনটি প্রয়োগে এরইমধ্যে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। এর আগে একই ঘটনায় সারাদেশে একাধিক মামলা হতো। এখন হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে সেই প্রবণতা কমেছে।’

ছবি: ডয়চে ভলে

আর আর্টিক্যাল নাইনটিনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাবেক প্রধান তাহমিনা রহমান বলেন, ‘শুধু বাকস্বাধীনতা কেন, এখন তো সমবেত হওয়ার, সমাবেশ করার স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ডিএসএর ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। কোথায় কোথায় সমস্যা তা সরকারকে আমরা জানিয়েছি। কিন্তু আইনের কোনো সংশোধন হয়নি। এর অপপ্রয়োগ চলছেই। আমার মনে হয় নির্বাচনের আগে এই আইনের কোনো সংশোধন হবে না।’

তার কথা, ‘নির্বাচনের আগে আমরা আগেও বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হতে দেখেছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয়না। আর এখন অন্যান্য আইনের প্রয়োগ তেমন হয় না। তাই ডিএসএর ব্যবহার বাড়ছে। সেটাই অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হয়।’

তিনি বলেন, ‘আরও নতুন যে তিনটি আইন বাকস্বাধীনতার বিপক্ষে যাবে বলে আমরা মনে করছি সেই তিনটি আইন নির্বাচনের আগে পাস হবে বলে আমার মনে হয় না। ফলে ডিএসএর ব্যবহার বাড়বে বলে আমার আশঙ্কা।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম