ইত্তেফাকের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকার

মন্দার পূর্বাভাসের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে : ড. জাহিদ হোসেন

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:৩২

বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা আসন্ন। এ বছর কঠিন সময় হতে যাচ্ছে—এমন পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা থেকে। এর ধাক্কা বাংলাদেশেও পড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এজন্য আমাদের শিল্পের চাকা সচল রাখতে হবে। আমদানি চেপে রাখলে অর্থনীতিতে গতি বাড়বে না। আর এখানেই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’ 

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির সামনে মূল্যস্ফীতি আর ডলারের সংকট বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু সেটি খুবই সামান্য। এখন আমনের ভরা মৌসুম। কৃষকের গোলায় ধান উঠছে। তাছাড়া শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে, বাজারে আসছে। সেজন্য খাদ্যমূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি খুব একটা কমেনি, তবে সুখবর হলো, বাড়েওনি, যা ১০ শতাংশের কাছাকাছি আছে। কিন্তু ডলারের সংকট আমাদের রয়েই গেছে। এটি আমরা এখনো কোনো সুরাহা করতে পারিনি। যদিও রপ্তানিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এটির সুফলে যে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ছে, তার ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের এই মন্দার ধাক্কা উন্নয়নশীল বিশ্বেও পড়ছে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, নতুন বছরেই মন্দার কবলে পড়বে বিশ্বের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ দেশ। সংস্থাটির এই পূর্বাভাস ইউরোপিয়ান অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যেসব অর্থনীতির দেশ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা মন্দার কবলে পড়বে। ইউরোপে যে একটি গভীর মন্দা আসছে বলা হচ্ছে, সেটা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমাদের রপ্তানির এ ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ডলারের সংকট মোকাবিলার জন্য এ পর্যন্ত আমদানিকে চেপে রাখার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমেছে, তার প্রধান কারণ আমদানি অনেক কমানো হয়েছে। কিন্তু আমদানিকে এভাবে চেপে রাখলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। আমাদের আমদানির ৮০-৯০ শতাংশই হচ্ছে উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমদানি। ভোগ্যপণ্যের আমদানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আমদানির সিংহভাগই হচ্ছে শিল্পের কাঁচামাল, প্রক্রিয়াজাত উপাদান ও যন্ত্রপাতি। এসব আমদানি চেপে রাখলে অর্থনীতিতে গতি বাড়বে না বলে তিনি মনে করেন। আর এখানেই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’       

এমন সংকটের মধ্যে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় সাড়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। এটা খুবই ভালো খবর। তবে এত সংকটের মধ্যেও এ ধরনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছু প্রশ্নও তৈরি করে। আমেরিকার অর্থনীতি এখনো শক্ত অবস্থানে আছে। এর মধ্যে রপ্তানি কীভাবে এত ভালো অবস্থানে থাকে, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠন মনে করছে, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেশি পেয়েছে। কিছু বাজার আছে, যেখানে মন্দা এখনো আসেনি। গত বছরও মন্দা ছিল না। ফলে রপ্তানির যে প্রবৃদ্ধির কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে চাইছিল সরকার, সেটার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

তবে এর জন্য স্বস্তিতে থাকার কিছু নেই। কারণ মন্দার যে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে, সেটা কিন্তু আসবে। আর মন্দা হলে আমাদের রপ্তানিতে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। কত বড় আঘাত আসবে, সেটা নির্ভর করছে মন্দা কত গভীর হবে তার ওপর। আগামী বছরের জন্য আমাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রপ্তানির সুবাতাসে গা ভাসিয়ে না দিয়ে এ সময় কৃষকের প্রয়োজনীয় ডিজেল, সার, বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি খাতসহ শিল্পোৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন বছরের শুরুতেই অর্থনীতির তিন সূচকেই সুখবর মিলেছে। মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমেছে। বেড়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি কমা মানে পণ্যের দাম কমাটা বোঝায় না। মূল্যস্ফীতি কিছু কম মানে হচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার কমেছে। কিন্তু যেটি হয়েছে, সেটিও তো অনেক বেশি। বাজারে আমন ধান ও শীতের সবজি আসায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী হলেও খাদ্যবহির্ভূতি পণ্যের ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পের চাকা সচল রাখার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ