বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গ্রন্থলোক

রণাঙ্গনের যোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০৬

বাং লাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনবদ্য প্রেক্ষাপট। মুক্তিযুদ্ধের ভেতরের কথা আমরা জানতে পারি  রণাঙ্গনের যোদ্ধারা জীবিত আছেন তাঁদের কাছে গল্প শুনে বা তাদের লেখনীর মাধ্যমে। এমনই এক উপজেলার জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা প্রকাশিত হয়েছে ‘বিজয়ের ময়দানে রাণীশংকৈল’ বইটিতে। রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের বয়ান উঠে এসেছে এতে। আছে বীরাঙ্গনাদের জবানবন্দিও।

দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। অনেকে শহিদ হয়েছেন যুদ্ধের ময়দানে। বীরাঙ্গনাদের যে আত্মত্যাগ তা উপলব্ধি করতে হলে প্রয়োজন প্রতিটি এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের ও বীরাঙ্গনাদের যুুদ্ধদিনের স্মৃতি সবার সামনে তুলে ধরা। এর মাধ্যমে রণাঙ্গনের আসল চিত্রটি সবার সামনে উন্মোচিত হবে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিজয়ের ময়দানে রাণীশংকৈল’ বইটি। এতে স্থান পেয়েছে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ১৪ জন বীরাঙ্গনার স্মৃতি। বইটি সম্পাদনা করেছে ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ইউএনও সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির (স্টিভ)।

বইটির বিশেষেত্ব হলো এতে রাণীশংকৈলের কয়েকজন বীরাঙ্গনার যুদ্ধকালীন নির্যাতনের ঘটনা রয়েছে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট, যুদ্ধাকালীন ঘটনার বর্ণনা, যুদ্ধকালীন পরিবারের যন্ত্রণা ও নির্যাতন, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর পরিবারের সদস্যদের অনুভূতি এবং যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর পরিবারের সদস্যদের অনুভূতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চান এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর লেখা জমা দিয়েছেন মোট ৬৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের কষ্ট, যন্ত্রণা ও নির্যাতনের কথা জানা যাবে। বিশেষভাবে বীরাঙ্গনাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা কল্পনাতীত। পাকহানাদার বাহিনী শুধু বীরাঙ্গনাদের ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, অনেক বীরাঙ্গনাই অকথ্য পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন। কেউ কেউ পাগল হয়ে যান। বীরাঙ্গনা টেপরীর বর্ণনায় ফুটে উঠেছে সেই যন্ত্রণালব্ধ দিনের স্মৃতি। তাঁর বিয়ের দুই মাস পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় তাঁর স্বামী বাবা-মাকে নিয়ে ভারতে চলে যায়। ধরা পড়েন টেপরী। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। সেখানে তাঁর ওপর চলে ধর্ষণ ও নির্যাতন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা তাঁকে দুই মাস ক্যাম্পে রেখে ধর্ষণ করে। এতে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। সেই সময় গ্রামের লোকেরা টেপরীর পরিবারকে একঘরে করে রাখে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তাঁর সন্তান জন্ম নেয়। তারপর শুরু হয় নতুন জীবন। এরপর শেখ হাসিনার সরকার বীরাঙ্গনাদের গেজেটভুক্ত করলে তিনি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। তাঁর কষ্ট-অনাহারে থাকার জীবন কিছুটা লাঘব হলেও সেই যুদ্ধদিনের স্মৃতি তাঁকে আজো তাড়িত করে। টেপরীর মতো অন্যান্য বীরাঙ্গনার একই অভিজ্ঞতা। তাঁদের ধর্ষণ করা হয়েছে, কামড়ে শরীর রক্তাক্ত করা হয়েছে। সিগারেটের আগুন দিয়ে হাত-পা পুড়িয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। খাবার দেওয়া হয়নি। সেই যন্ত্রণার দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো তাঁদের চোখে জল চলে আসে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা এ ডি আবুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদস্য। মার্চের শেষদিকে তিনিসহ আরো কয়েকজন বাঙালি সৈন্য ভারতে চলে যান। সেখানে তাঁদের সঙ্গে থাকা গোলাবারুদ বিএসএফের কাছে জমা দেন। এদিকে মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন তাঁর বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রাণীশংকৈলে যাওয়ার জন্য বিরোল বর্ডার দিয়ে যাত্রা শুরু করেন...। অপর এক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আয়েশ উদ্দিন অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি আহত হয়েছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৬ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে। দিনাজপুর মহারাজা হাই স্কুল ক্লোজিং ক্যাম্পে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মাইন ও অস্ত্র নিয়ে এসে জড়ো করে রাখার সময় মাইন বিস্ফোরণে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন এবং অনেকের সঙ্গে আয়েশ উদ্দিন আহত হয়েছেন। তারপর থেকেই তিনি যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এভাবে বইটিতে উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনের স্মৃতি আর বীরাঙ্গনাদের যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়ার জবানবন্দি।


বিজয়ের ময়দানে রাণীশংকৈল
সম্পাদক : সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবির (স্টিভ)
সহসম্পাদক : মারুফ আহমেদ
প্রচ্ছদ : মো. তারেক ইকবাল ও  সোহেলী আনার কবীর
মূল্য : ৩০০ টাকা

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন