শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রম্য

যেখানে রয়েছে চুরির অপার আনন্দ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৪৫

বইচুরির প্রসঙ্গ এলেই সঙ্গেসঙ্গেই আমার প্রাসঙ্গিকভাবে মনে পড়ে প্রেমের কথা। তা সে রাধাকৃষ্ণ বা ইউসুফ জুলেখার প্রণয়ই হোক অথবা পাশের বাড়ির মজনু আর মর্জিনার মায়ের প্রেমের কেচ্ছা। একটা কাজকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তার সামগ্রিক চেহারা ফুটে ওঠে। নতুবা তা অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো হয়ে যায়। যা আপনার আমার, বা সমাজের চোখে অত্যন্ত গর্হিত এক অপরাধ, সেটাই হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষিতে কেউ বা কারোর জীবনকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে সাহায্য করছে, অনুপ্রাণিত করছে নতুন করে বাঁচবার। লালনের সেই পঙক্তি—‘...বাকির লোভে নগদ পাওনা কে ছাড়ে এ ভুবনে/সহজ মানুষ ভজে দ্যাখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে...।’

নুসরাত ফতেহ আলী খাঁ সাহেবের কাওয়ালির অনুকরণে সেখানে গুনগুন করে ওঠা যাবে না যে—‘আঁখ উঠঠি মুহাব্বাত নে আংড়ায়ি দি, দিলকা সওদা হুয়া চাঁদনি রাত মে...।’ অর্থাত্ ‘হায়, এ কাকে দেখলাম আমি চাঁদনী চকের বাজারে—তার খঞ্জর আঁখিপট তো আমার নাজুকের দিলের ওপর পুরো ছুরি চালিয়ে দিয়ে গেল ...।’ কাজেই এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ জীবনের মাঝে পূর্ণতা খোঁজে। ভালোবাসে, ভালোবাসতে চায়। তার মনে যে ভালোবাসা, অথবা কামনার অথৈ সাগর—তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ সঙ্গীর খোঁজ করে। বর্তমান সঙ্গী যদি তাকে সেটা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে মানুষ—সে পুরুষ হোক কিংবা নারী—জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেবেই। তেমনিভাবে যতবার আমি সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তিগত লাইব্রেরির ধুলো জমা দর্শন-ইতিহাস-কবিতা-ক্লাসিক উপন্যাসের সরু কিংবা গুরু নিতম্ব বিশিষ্ট কেতাবসমূহের সামনে এসে দাঁড়াই, ততবার আমার মন চায় এদের। মন চায় এদের ব্যাগবন্দি করে ঘরে এনে দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে, নীরবে নিভৃতে পাটভাঙা শাড়ির আঁচল সরানোর মতো করে তাদের মলাট উন্মোচন করি। পেলব কোমল মখমলি ত্বকের মতো বইয়ের যে নগ্ন পাতা, তার বুকে হাত বুলাই। তারপর, রাতের পর রাত জেগে তার শরীরের মাঝে কলমের নিব ডুবিয়ে করি নোনা চাষাবাদ। লেখকের চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তার সঙ্গমে যা কিছু জন্মায়, পাশে ফুটনোটে মন্তব্যে তাদের লিখে রাখি। বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কলমের দাগ ছড়িয়ে ঘোষণা করি—এ কেবল আমার সাম্রাজ্য। কেবলি আমার।

যে বই পড়া হয় না, যে বই কেবলি গৃহসজ্জার অংশ হিসেবে খরিদ করে ফেলে রাখা হয় বাড়ির বুকশেলফের নিভৃততম কোনায়—সেই বইয়ের ছাপাখানার কলকব্জার মাঝে লিপিবদ্ধ, বাঁধাছাঁদা, সুঁইয়ের ফোঁড়ে এফোঁড় ওফোঁড় হওয়ার যন্ত্রণা পোহাবার কী প্রয়োজন? জ্ঞান তো মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়েছে আশ্রমের যুগে। তারপর মানুষ লেখা শুরু করল হাড়ে, গাছের পাতায়, পাথরে। হাতে লিখে কপি করবার যুগ পেরিয়ে এলো ছাপাখানার যুগ। মানুষের বাড়িতে বাড়িতে বইপত্তর দেখা গেল। এখন মানুষ পিডিএফ পড়ে। ছাপার হরফের বইয়ের মূল্য আকাশ ছোঁয়া। বই লেখা হ্যাপা, ছাপানো আরো হ্যাপা, সবচে বড় হ্যাপা হচ্ছে পছন্দের সব বই কিনে ঘরবোঝাই করা। বইচুরি তাই আজও প্রাসঙ্গিক।

এখন শেষকথা হচ্ছে, এই যে লেখাটিতে বারবার আমি আমি করলাম—এই ‘আমি’ কি আমি-ই? এমনটা ভেবে নিজের দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ করার মতো বুরবাকি করবেন না, প্রিয় পাঠক। খেয়াল করে দেখুন, আমার এ লেখাটি কিন্তু একটা আয়নার মতনও। যদি শুরু থেকে লেখাটির এই পর্যন্ত আদৌ পড়ে আসেন, তবে হলফ করে বলুন—এর ছত্রে ছত্রে নিজের চেহারা কি একবারের জন্যও দেখতে পাননি? কাজেই আমার লেখায় এই ‘আমি’কে এত গুরুত্বের সঙ্গে ব্যক্তি ‘আমি’র সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। এই অধম যদি কখনো আপনার বাড়িতে বেড়াতে আসে তবে তাকে নির্দ্বিধায় আপনার লাইব্রেরি রুমে নিয়ে বসাবেন। তারপর কিছুক্ষণ অধমকে নিজের মতো করে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেবেন। সেই ফাঁকে ধরুন আপনি চা-নাস্তা বানালেন। অতিথি আপ্যায়নে আমাদের সুনাম তো সিংহল থেকে মালয় সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, তাই না?

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন