ফেলানী হত্যার এক যুগ

‘মেয়েকে পাখির মতো গুলি করে মেরেছে’

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০৬

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর উত্তর অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে দেশে ফেরার সময় বিএসএফ’র গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায় ফেলানী। হত্যাকাণ্ডের একযুগ পার হতে চললেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পায়নি তার পরিবার।

বাবা নূরুল ইসলাম ও মা জাহানারা বেগম বলেন, সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা আজও ভুলতে পারিনি আমরা। চোখের সামনে আমাদের মেয়েকে তারা পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। এখনও ঘুমের মধ্যে তার আত্মচিৎকার শুনতে পাই। গভীর রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যায়। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। বিষাদে ভরে যায় মন। হতভাগা আমরা।

তারা বলেন, মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মানবাধিকার সংস্থাসহ বহুজনের কাছে গিয়েছি। কিন্তু ১২ বছরেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পেলাম না। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। দুদেশের সরকারের কাছে আবেদন ফেলানী হত্যার বিচার যেন তারা করে দেয়। আমারা এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছি।

এদিকে, গত কয়েক বছরের মত এবারও শনিবার (৭ জানুয়ারি) বেলা ১১টার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন পালন করবে ঢাকাস্থ নাগরিক পরিষদ।  

নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন বলেন, এর মাধ্যমে তারা ফেলানী হত্যাকারী বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের ফাঁসি, ফেলানীর পরিবারসহ সীমান্ত আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত সকল ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পার্ক রোডের নাম ফেলানী সরণী রাখার দাবি জানাবেন।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবর বিশ্বব্যাপী সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও ৭ জানুয়ারি ফেলানী দিবস পালনের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবর ২০১৫ সালে তারা একটি স্মারকলিপি দিয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় এটি বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের সদস্য যে কোনো রাষ্ট্রকে প্রস্তাব আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা জামান বলেন, বিষয়টি আন্তর্জাতিক। এরপরও আমি ফেলানী হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং সীমান্তে হত্যা বন্ধের দাবি জানাই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী জানান, মামলাটি ভারতের সুপ্রিমকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর অনন্তপুর সীমান্তে ৯৪৭নং আন্তর্জাতিক ৩নং সাব পিলারের পাশ দিয়ে মই বেয়ে কাঁটাতার ডিঙ্গিয়ে বাবার সঙ্গে দেশে ফিরছিল নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের কিশোরী ফেলানী। এ সময় টহলরত ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে সে নিহত হয়। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা কাটা তারে বেড়ার সঙ্গে ঝুলে থাকে।

২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট কোচবিহার জেলার বিএসএফ’র ১৮১ সদর দপ্তরে স্থাপিত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যার বিচারকার্য শুরু হয়। ৫ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে। রায় প্রত্যাখ্যান করে ১১ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা ভারতীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে সে দেশের সরকারকে ন্যায় বিচারের আশায় পত্র দেন। আবারও ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে তা একাধিকবার স্থগিত হয়।

এছাড়াও ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ১ম ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী ২য় বাদী হয়ে আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া) সচিব এবং বিএসএফ’র মহাপরিচালককে বিবাদী করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নয়াদিল্লীতে ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী একটি ফৌজদারি মামলা করেন। তারা ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ফেলানীর বাবার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ চেয়ে আরও একটি আবেদন করেন।

পরে ২০১৫ সালে আইন ও শালিস কেন্দ্র এবং ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ আরও একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করে। ৩১ আগস্ট ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সেদেশের সরকারকে ফেলানীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে পাঁচ লাখ রুপী প্রদানের অনুরোধ করেন। এর জবাবে সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামকে দায়ী করে বক্তব্য দেয়। এরপরে ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য হলেও তা আজো হয়নি।

ইত্তেফাক/আরএজে