শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকিতেও বাড়ছে বিদ্যুতের দাম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩, ২২:০০

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ফের বিদ্যুতের দাম শতকরা ১৫ ভাগেরও বেশি বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। সীমিত আয়ের মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিদ্যুতের দামে আরও পিষ্ট হবে।

তাদের কথা, এর ফলে দ্রব্যমূল্যসহ আরও অনেক কিছুর দাম বেড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। কিন্তু দুর্নীতি আর অপচয় কমাতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। বিবিএস-এর হিসেবে এখন মূল্যস্ফীতি আট দশমিক ৮৫ শতাংশ।

বাড়তি দাম চলতি মাসেই

রোববার সঞ্চালন সংস্থা ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সর্বনিম্ন ১৫.৮ থেকে সর্বোচ্চ ২৭.৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে বিতরণকারী সংস্থাগুলো। তাদের আবেদনে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা দাম ইউনিট প্রতি এক টাকা ১০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করে বিইআরসি। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে এই বাড়তি দাম কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে চলতি মাসেই বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানাগেছে।

বিইআরসি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের খুচরা মূল্য ১ টাকা ১০ পয়সা বৃদ্ধির যে সুপারিশ করেছে সেই হিসাবে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ১৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৩ পয়সা করা হচ্ছে। এতে গড়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে ১৫.৪৩ ভাগ।  

ছবি: সংগৃহীত

ভর্তুকি কমাতে গত বছরের ২১ নভেম্বর পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯.৯২ শতাংশ বাড়ানোর নেয় বিইআরসি। এখন খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২০ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম বড়ানো হয়। তখন পাইকারিতে দাম ৮.৪ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৫.৩ শতাংশ বাড়ানো হয়।

ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ছে

পিডিবির বলছে, প্রতি টন কয়লার দাম ২৪ হাজার টাকা ( ২৩০ ডলার) এবং প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়ার জন্য নতুন দামের পরও বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। কিন্তু বিইআরসি পাইকারি দাম বৃদ্ধিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এই মূল্য কাঠামো ধরে দাম বাড়ানো হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে না।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বলছে দাম না বাড়লে তাদের ক্ষতি হবে এক হাজার ১২৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২৩৪ কোটি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) এক হাজার ৫৫১ কোটি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) এক হাজার ৪০২ কোটি টাকা, নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) ৫৩৫ কোটি টাকা লোকসান হবে বলে দাবি করা হয়েছে। ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) কোনো আর্থিক পরিমাণ না বললেও দাম না বাড়লে তাদের ক্ষতি হবে বলে দাবি করেছে।

‘দুর্নীতি বন্ধ হলে ভর্তুকিও লাগবে না, দামও বাড়াতে হবে না'

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী শামসুল আলম মনে করেন, ‘দুর্নীতি ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করার কারণে জ্বালানি খাতে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যদি দুর্নীতি ও লুণ্ঠন কমানো যায় তাহলে বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবেনা। ভর্তুকিও দিতে হবে না। আমরা গণশুনানিতে এটা তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছি।’

ছবি: সংগৃহীত

তার কথা, ‘ইউটিলিটি খরচ কমানোর জন্য আমরা বলেছি। কিন্তু সেটা তারা করছেনা। তারা কোনো যুক্তিই মানতে চায় না। দাম বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে তো আর ডলার আনা যাবে না। ডলারের ঘাটতি তো পূরণ হবে না। জ্বালানি আমদানি করতে তো ডলার লাগবে। বেসরকারি খাতে পাঁচ মাসের বিদ্যুৎ বিল বাকি আছে। তারা দিতে পারছে না।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়লেও তো নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারবেনা পিডিবি। শিল্প খাত উৎপাদন ঠিক রাখতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ তো পাবেনা। পিডিবি তো নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এরকম হলে তো জ্বালানি নিরাপত্তা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।’

আর এর ফলে সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। তার ফলে যদি মানুষের ভোগ কমে যায় তখন উৎপাদন কমবে এবং জিডিপি কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে?

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটুকু আছে সেই আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় যে এই সময়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এখন দাম বাড়ালে দেশের অর্থনীতির যা অবস্থা তাতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। সেটা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে সব ধরনের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। যা বহন করতে হবে ভোক্তাদের। একদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত দাম দিতে হবে। আবার পণ্যের জন্য বেশি দাম দিতে হবে। এই দুই মুখী চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।’

ছবি: সংগৃহীত

তার কথা, ‘বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিখাতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম কম রাখা প্রয়োজন। আমরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময়ও একই কথা বলেছিলাম। সেচের জন্য কৃষকদের কম দামে ডিজেল দেওয়ার জন্য কার্ড সিস্টেম চালুর জন্য বলেছিলাম। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। নয়তো খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ খাতকে র‌্যাশনালাইজ করা উচিত। এখানে ব্যাপক অপচয়, দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি আছে। সেগুলো ঠিক করা গেলে আসলে ভর্তুকি অনেক কম লাগত। তখন হয়তো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ত না। প্রয়োজন হলেও তা অনেক কম হারে বাড়াতে হতো।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম