ঐতিহাসিক দিন, ঐতিহাসিক কবিতা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:০৩

বঙ্গবন্ধুকে  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১টা ৩০ মিনিটে  ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে সামরিক জিপে তুলে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেই রাতে তাঁকে আটক রাখা হয় তৎকালীন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল, বর্তমান শহীদ আনোয়ার উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে। পরদিন তাঁকে নেওয়া হয় ফ্ল্যাগস্টাফ হাউসে, সেখান থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিমানে নেয়া হয় করাচিতে। পরে পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি রোডে অবস্থিত মিয়ানওয়ালী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাখা হয়।

২৯০ দিন কারাবন্দির পর ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভ করে লন্ডন-দিল্লি হয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। 

এই প্রত্যাবর্তণ নিয়ে একটি অসাধারণ কবিতা লিখেছেন কবি কামাল চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দশটি সেরা কবিতার একটি ‘১০ জানুয়ারি ১৯৭২’।

"যেদিন তিনি ফিরে আসলেন, সেদিন

শীতার্ত আলো হাওয়ার মধ্যে ঋতুবদল হলো স্বদেশের

ঝরাপাতায় জেগে উঠল বসন্ত

শাখায় শাখায় ফুটে উঠল পাতা

লক্ষ কোটি মানুষের উল্লাসের মধ্যে সূর্যোদয় হলো

স্তব্ধতার মধ্যে বেজে উঠল সুর

অসংখ্য পাখির গানে মুখরিত হলো শঙ্কিত আকাশ।

তিনি ফিরে আসলেন, তখনো এই মাটি রক্তে ভেজা

চতুর্দিকে শোক, আহাজারি, ধ্বংসচিহ্ন, পোড়াগ্রাম, বিধ্বস্ত জনপদ

তিনি ফিরে আসলেন, ধ্বংসস্তূপের ভেতর ফুটে উঠল কৃষ্ণচূড়া

মুকুলিত হলো অপেক্ষার শিমুল

শোক থেকে জেগে উঠল স্বপ্ন, রক্তে বাজল দারুণ দামামা

বেদনার অশ্রুরেখা মুছে ফেলে

'জয় বাংলা, জয় বাংলা' বলে হেসে উঠল

লতাগুল্ম, ধূলিকণা, পরিপূর্ণ দীপ্ত পতাকা"।

কবিতার প্রথম স্তবকে প্রকৃতির প্রাকৃতিক বর্ণনায় প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যেমন- শীতার্ত আলো, ঋতুবদল, একদিকে শীতের ঝরাপাতা, অন্য বসন্তে নতুন পাতা, স্তব্ধতার মধ্যে আগমনী সুর, রক্তে ভেজা মাটি, চতুর্দিকে শোক, ধ্বংসচিহ্ন এইসবের মধ্যেও জয় বাংলা স্লোগান এবং পরিপূর্ণ দীপ্ত পতাকা।

উল্লেখিত ঐতিহাসিক কবিতার প্রতিটি লাইনই এক একটি কবিতা। প্রথম স্তবকের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় স্তবকটিও অনুরূপ একাধিক চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ; সেই সাথে মাটি এবং মানুষের চিত্রও তুলে এনেছেন। যেমন- নদী, ঝর্ণা, সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য, শুভ্র আকাশ, শস্যক্ষেত, গ্রাম তারপর গ্রামের কৃষক-শ্রমিক, শিশু কোলে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাম্যবধূ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের অপেক্ষায় থাকা জননীও সেদিন আনন্দ-বেদনায় স্বতস্ফুর্ত স্বাগত জানাচ্ছিলো মৃত্যুর দ্বার থেকে স্বদেশে ফিরে আসা প্রিয় নেতাকে!

তৃতীয় স্তবকে আমরা পাচ্ছি- পুরো বাংলাদেশকে। পাঠ করা যাক সেই পংক্তিগুচ্ছঃ

"তখন সারা বাংলায় অপেক্ষায় অধীর মানুষ

প্রতিটি হৃদয় স্পন্দিত বজ্রকণ্ঠে

পিতার জন্য অপেক্ষা করছে সন্তান

বন্ধুর জন্য ভাই

নেতার জন্য মুগ্ধ অনুসারী

জনকের জন্য আবহমান এক দেশ"।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত মানুষের যে সমাবেশ এবং স্বতস্ফুর্তা ছিলো, তা ভিডিও বা আলোকচিত্রে নয়; কামাল চৌধুরী তাঁর আলোচ্য কবিতায় অসাধারণ কাব্যিক চিত্রে জ্বলন্ত করে রেখেছেন। যা যুগ যুগ ধরে সেই ঐতিহাসিক দিনটি জ্বলজ্বল করবে।

"তিনি আসলেন- মৃত্যুপুরী থেকে জেগে উঠল দেশ

মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল থেকে আতশবাজির মতো

ফুটতে থাকল উল্লাসের বুলেট-বৃষ্টি

বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত প্রতিটি সড়ক

ভরে উঠল ভালোবাসার ফুলে

বাতাসে ধ্বনিত হলো 'স্বাগতম'- চতুর্দিকে উৎসব, চতুর্দিকে আনন্দ

চতুর্দিকে স্বাধীনতা"।

আলোচ্য কবিতার মাধ্যমে কবি ইতিহাস তুলে এনেছেন। কবিতাটির শেষ স্তবককে প্রকৃত বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট, ব্যক্তিত্ব এবং জনগণের ভালোবাসা-শ্রদ্ধার চিত্র এঁকেছেন এই ভাবেঃ

"তিনি ফিরে আসলেন

অগণিত মানুষের আনন্দ অশ্রুজলে ভাসতে ভাসতে বললেন

দ্যাখো, আমি মরি নাই

তোমাদের ভালোবাসা আজ আমাকে ফিরিয়ে এনেছে"।

কামাল চৌধুরী সম্পাদিত ‘মহাকালের তর্জনী’ শীর্ষক গবেষণালব্ধ কাব্য সংকলন’টি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলাম- ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী কবিদের মধ্যে কামাল চৌধুরী অন্যতম। সেই প্রতিকূল পরিবেশে, বৈরী রাজনৈতিক রাহুগ্রাসের বিরুদ্ধে নানা ভাবে দুঃসাহসী ভূমিকা নিয়েছেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে অবসর জীবনে পা দিয়েও তিনি ধারাবাহিক ভাবে বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ স্বেচ্ছাসৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি বাস্তবায়নের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সম্পাদনা করেছেন বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং লিখেছেন দারুণ সব কবিতা। তার মধ্যে ‘১০ জানুয়ারি ১৯৭২’ কবিতাটি একটি ঐতিহাসিক কবিতা।

ইত্তেফাক/এএইচপি