মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনীতিতে গতি আনবে মেট্রোরেল

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:১১

মেট্রোরেল বিশ্বের অনেক বড় শহরে গণপরিবহনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেলব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের গণপরিবহন চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য—মানুষের যোগাযোগকে সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করা। মেট্রোরেল যানজট এড়িয়ে গণমানুষের যাতায়াতের সময় বাঁচাবে। এর ফলে অনেক কর্মঘণ্টা আমরা পাবো। যে কর্মঘণ্টাগুলো মানুষ কোনো না কোনো কাজে লাগাতে পারবে। এমনকি মানুষ যদি বিশ্রামও নেয়, তাতে তাদের অন্য কাজের গতিশীলতাও বাড়বে। অর্থাৎ মেট্রোরেলের মাধ্যমে শুধু যে তাৎক্ষণিক যাতায়াতের সময় বাঁচবে তা নয়, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাও বাড়বে।

মেট্রোরেলের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৮৬৩ সালে লন্ডনের প্যাডিংটন থেকে ফারিংডন পর্যন্ত ছয় দ্রুত ট্রানজিট সিস্টেমে কিলোমিটার বিশেষ রেলপথ চালু হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মেট্রোরেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উক্ত রেলপথ এখন ‘লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর একটি অংশ। ১৮৯০ সালে এসে লন্ডন মেট্রোতে যুক্ত হয় ইলেকট্রিক রেল। লন্ডন মেট্রোরেলে বছরে প্রায় ১১৭ কোটি মানুষ যাতায়াত করে। তারপর থেকেই শুধু সামনে তাকানেরা গল্প। লন্ডনের চৌহদ্দি ছাপিয়ে বাতাসের বেগে মেট্রোরেল ছড়িয়ে পড়ে সারা ১৮৬৮ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দ্রুত ট্রানজিট রেলব্যবস্থা চালু করে এবং ১৯০৪ সালে, নিউ ইয়র্ক সিটি সাবওয়ে প্রথম বারের জন্য খোলা হয়েছিল।

এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে, জাপান হলো প্রথম দেশ যেটি ১৯২৭ সালে একটি পাতাল রেলব্যবস্থা তৈরি করে। ভারত ১৯৭২ সালে কলকাতায় তার মেট্রো সিস্টেম নির্মাণ শুরু করে। এরপরে ভারত অন্যান্য শহরেও মেট্রোরেল ব্যবস্থা তৈরি করে। বর্তমানে, বিশ্বের ৫৬টি দেশের ১৭৮টি শহরে ১৮০টি পাতাল রেলব্যবস্থা চালু রয়েছে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে মেট্রোরেল চালু হয় ১৮৯৬ সালের মে মাসে। ২০০২ সালে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেসকো। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বোস্টন সাবওয়ে। এটি চালু হয় ১৮৯৭ সালে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত তিনটি মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক রয়েছে যথাক্রমে জাপানের টোকিও, চীনের বেইজিং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে। এর মধ্যে টোকিও সাবওয়ে এশিয়ার প্রথম মেট্রো নেটওয়ার্ক চালু হয় ১৯২৭ সালে। মিশরের কায়রো, তিউনিসিয়ার তিউনিস, আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স, ইথিওপিয়ার আদ্রিস আবাবাসহ আফ্রিকার কয়েকটি শহরেও মেট্রোরেল চালু রয়েছে।

জাপানের রাজধানী টোকিওতে মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হয় ১৯২৭ সালে। জনবহুল শহর টোকিওর বাসিন্দাদের যাতায়াতে প্রচুর সময় বাঁচাচ্ছে মেট্রোরেল। একই সঙ্গে বাড়িয়েছে শহরটির অর্থনৈতিক উপযোগিতাও। বিভিন্ন দেশের বড় শহরগুলোর নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানের নজর থাকে মূলত মেট্রোরেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় গণপরিবহনের জন্য ‘ঢাকা মেট্রোরেল’ প্রকল্পটি রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) পরিচালনা করছে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, ‘ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা ‘মেট্রোরেল’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দ্বারা অনুমোদিত হয়।

উল্লেখ্য, যানজটের কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০০৪ সালে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতি ছিল প্রায় ২১ (২১.২ কিমি/ঘণ্টা), কিন্তু ২০১৫ সালে তা ৬ (৬.৮ কিমি/ঘণ্টা) এ নেমে আসে। ২০১৮ সালে পরিচালিত বুয়েটের একটি সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকা শহরের যানজটের জন্য বার্ষিক ৪.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, যা জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩.৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট কর্মঘণ্টার মূল্য বিবেচনায় নিলে ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার যানজট ৬০ শতাংশ কমাতে পারলে বাংলাদেশ ২.৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে যেতে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি। মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। এটি প্রত্যাশিত যে, এ ধরনের পরিবহন মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন করে এবং তাদের উৎপাদনশীল সময় বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ইত্তেফাক/এমএএম