সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট

শুধু দগ্ধদের চিকিৎসাই নয়, হচ্ছে সব ধরনের জটিল অপারেশন

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:৩১

শুধু আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসাই নয়, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে হচ্ছে সব ধরনের জটিল অপারেশন। ১৮ তলা একটি ভবনের মধ্যে ইনস্টিটিউটটি। এই এক ভবনের মধ্যে হচ্ছে স্তন-ওরাল-হাত-পা-স্ক্রিন ক্যান্সার সার্জারি, ঠোঁট-তালু কাটাসহ জন্মগত শারীরিক ত্রুটি, কমসেটিক সার্জারি, অক্সিজেন থেরাপি, নানা ধরনের ইনজুরি ও পোড়া রোগীদের চিকিৎসা।

ডায়াবেটিসের কারণে যাদের হাত-পা পচে যায় তাদের চিকিৎসাও হচ্ছে এখানে। রোগীদের এসব সেবা দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। গত এক বছরেই অপারেশন হয়েছে দশ হাজার পাঁচশতটি। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টি রুটিন অপারেশন হচ্ছে। এ ছাড়া ইমার্জেন্সি অপারেশন হয় দিনে প্রায় ৩০টি।

জন্মগত ঠোঁট ও তালু কাটা মানুষদের এক সময় প্রতিবন্ধী মনে করা হতো। পোড়া রোগী সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরত পারতেন না। কারণ শরীরে থেকে যেত পোড়া চামড়ার দাগ। বেঁকে যায় অনেকের হাত পা।

পোড়া রোগীদের ৯৮ ভাগেরই প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ চিকিৎসা সেবা। যা দরিদ্র কিংবা মধ্যবিত্তদের পক্ষে বহন করা সম্ভব না। ধনী রোগীরাই বিদেশে গিয়ে এ চিকিৎসা করাতে পারেন। এখন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে বিনামূল্যে এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায়। 

কয়েকজন গরীব রোগী বলেন, বিনামূল্যে সেবা পাওয়া আমাদের কাছে এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর ৫০০ বেডের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করা হয়।

এখানে আসা রোগীদের চিকিৎসা বা কোনো পরীক্ষার জন্যই বাইরে যেতে হচ্ছে না। হাসপাতালেই রয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। চিকিৎসাসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে রয়েছে ভবনে সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ব্যবস্থা । সংকটাপন্ন রোগী জরুরি ভিত্তিতে আনা নেওয়ার জন্য হেলিপ্যাড।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সব যন্ত্রপাতি অত্যাধুনিক, যা সরাসরি জাপান থেকে আনা। মেইনটেনেন্স ব্যবস্থাপনা ধরে রাখা হবে এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চিকিৎসাধীন রোগীরা বলেন, এমন একটি ইউস্টিটিউট না থাকলে জীবনে চিকিৎসা সেবা পাওয়া অসম্ভব ছিল। ১০ হাজার টাকা এক সাথে করার সামর্থ্য নেই, বিদেশে গিয়ে এত ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা নেবো কিভাবে? এমন মন্তব্যও করেছেন রোগীরা। দেশে প্রতি বছর ১ কোটি মানুষের ট্রমা ইনজুরি হয়। এর ৩০ ভাগ অর্থপেডিক সার্জারি এবং ৬০ ভাগেরই প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন পড়ে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গতকাল ভর্তি ৫০০ রোগীর মধ্যে শতাধিক ছিল ট্রমা ইনজুরিতে আক্রান্ত। দেশে নারীদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় স্তন ক্যান্সারে। এর চিকিৎসার জন্য এখানে আছে পূর্ণাঙ্গ একটি ইউনিট। দেশে ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৮ জন জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এটি একটি জেনিটিক্যাল রোগ। গর্ভকালীন নানা ওষুধ খাওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি হয়। আর জন্মগত ত্রুটি রোগীদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ ভাগই দরিদ্র মানুষ। পুষ্টির অভাবে এই রোগ হয়। এটা  ব্যয়বহুল চিকিৎসা।

ইনজুরির কারণে হ্যান্ড সার্জারির প্রয়োজন হয়। এটিসহ টিউমার অপারেশনও হচ্ছে এই হাসপাতালে। অক্সিজেন থেরাপির ব্যবস্থা রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে মুখমন্ডল ও শ্বাসনালী পোড়া রোগীদের ক্ষতস্থান শুকায় না। এ সকল রোগীদের অক্সিজেন থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। কসমেটিক সার্জারি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরাও বিনামূল্যে এই হাসপাতালে এই সেবা পাচ্ছেন। পোড়া রোগীদের ৪ থেকে ৫ বার অপারেশন করতে হয়। এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল। সর্বনিম্ন ১০ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা খরচ হয়। পোড়া রোগীদের মধ্যে ৯৮ ভাগেরই প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা রোগীরা পাচ্ছেন বিনামূল্যে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা পোড়া রোগীদের মধ্যে ৮০ ভাগই ঢাকার বাইরের রোগী।     

ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপকৃত হয়েছেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা। আগে এসব রোগীরা চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তাই করতে পারতো না। এখন বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। দেশের ঠোঁট কাটা ও তালু কাটা রোগীরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাচ্ছেন।  

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, একসময় সাধারণ গরিব কিংবা মধ্যবিত্তরা এই চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আশাই করতে পারতেন না। বিদেশিরা এসে এক সময় চিকিৎসা সেবা দিতেন। কিন্তু তারা ৫০ থেকে ৬০টির বেশি অপারেশন করতে পারতেন না। এখন এ দেশেই পাচ্ছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা। বর্তমান সরকার এই চিকিৎসা সেবার যে ব্যবস্থা করছেন সেটা ধারণার বাইরে। এই ধরনের পূর্ণা-ঙ্গ ইনস্টিটিউট বিশ্বের কোথাও নেই।

 

ইত্তেফাক/ইআ