বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ল তিন গুণ

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:০১

দেশে সাত মাসের ব্যবধানে আবারও বাড়ল গ্যাসের দাম। আগের দফায় সিএনজি বাদে সব শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও এ দফায় বিদ্যুৎ, শিল্প এবং বাণিজ্য শ্রেণির গ্রাহকদের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। মাঝারি শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাসের দাম সবচেয়ে বেশি-১৭৯ শতাংশ বা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার দাম বাড়েনি আবাসিক, সিএনজি, সার এবং চা-শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে বিদ্যুৎ, শিল্পজাত পণ্যের দাম এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হোটেল-রেস্টুরেন্ট পরিচালনায় খরচ বাড়বে।

গতকাল বুধবার গ্যাসের নতুন মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন দর কার্যকর হবে। এর আগে গণশুনানির মাধ্যমে গত জুনে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের দাম নির্বাহী আদেশে বাড়ানোর পর এবার গ্যাসের দামও নির্বাহী আদেশে বাড়াল সরকার।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় বাজারে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্প পিছিয়ে পড়বে। তবে নিরবচ্ছিন্ন এবং স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ শিল্প-কারখানার লাভ কম হলেও টিকে থাকতে পারবে। তা না হলে রপ্তানিমুখী শিল্পে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন,  এ দাম বৃদ্ধি অযোক্তিক ও অন্যায্য। বিইআরসিকে অনেকটা অকার্যকর করে দেওয়া হলো। সরকারি সংস্থাগুলোর দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা এবং অপচয়ের কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নে জোর নেই। আগ্রহ বেশি আমদানির দিকে। এর ফলে আরেক বার বাড়াতে হলো গ্যাসের দাম। বিদ্যমান নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অব্যাহত ধারার মধ্যে গ্যাসের দামবৃদ্ধি জনগণের ওপর বড় আঘাত।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা বাড়িয়ে ১৪ টাকা এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ (শিল্প-কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র) খাতে গ্যাস প্রতি ঘনমিটারে দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও বৃহৎ শিল্পে ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা, মাঝারি শিল্পে ১১ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা এবং ক্ষুদ্র শিল্পে ১০ দশমিক ৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। আগে বড়, মাঝারি ও ছোট শিল্পের জন্য পৃথক মূল্যহার থাকলেও এখন তিন ধরনের শিল্পের জন্য গ্যাসের একই দর ধরা হলো। বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগে (হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেট ও অন্যান্য) প্রতি ঘনমিটারের দাম ২৬ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রজ্ঞাপনে আবাসিক গ্রাহকদের এক চুলার দাম আগের সমান ৯৯০ টাকাই রাখা হয়েছে। একইভাবে দুই চুলার দাম ১ হাজার ৮০ টাকাই রয়েছে। পরিবহন খাতে সিএনজিতেও প্রতি ঘনমিটার ৪৩ টাকা এবং চা- শিল্পের গ্যাসের দামও আগের মতো প্রতি ঘনমিটার ১১ টাকা ৯৩ পয়সা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দামও আগের মতোই আছে। জরুরি এই খাতটিতে সরবরাহকৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম আগে নির্ধারিত ১৬ টাকাই রাখা হয়েছে। গত জুনে সার কারখানায় ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

প্রজ্ঞাপনে আরো উল্লেখ করা হয়, প্রতি ঘনমিটার সিএনজি মূল্যহারের মধ্যে ফিড গ্যাসের মূল্যহার ৩৫ টাকা ও অপারেটর মার্জিন ৮ টাকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এদিকে আবাসিক খাত ছাড়া অন্যান্য গ্রাহকশ্রেণি যেমন বিদ্যুৎ (সরকারি, আইপিপি ও রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র), ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ (ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট, স্মল পাওয়ার প্ল্যান্ট ও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র), সার, শিল্প, চা-শিল্প (চা-বাগান), বাণিজ্যিক (হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য) এবং সিএনজির ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারে (মাসিক অনুমোদিত লোডের বিপরীতে) ১০ পয়সা হারে ডিমান্ড চার্জ আদায় করবে বিতরণ কোম্পানিগুলো। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে। অর্থাৎ পোস্টপেইড গ্রাহকরা মার্চ মাস থেকে এবং প্রিপেইড গ্রাহকরা ফেব্রুয়ারি থেকেই নতুন দামে গ্যাসের দাম পরিশোধ করবে।

এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দামও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগামী মাসে কিংবা মার্চে দামবৃদ্ধির নতুন ঘোষণা আসবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। অর্থ ও ডলার সংকটে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানির আমদানি-সংস্থান করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসসংকট তীব্র এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি হাতের নাগালের বাইরে যাওয়ার আগে গ্রাহকদের কাছ থেকে আরো রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এ দফায় দাম বাড়ানো হলো। অর্থের জোগান বাড়ানো এবং সরকারের ভর্তুকির মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হবে।

উল্লেখ্য, দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬৬-২৭০ কোটি ঘনফুট। প্রতিদিন ৩১০-৩২০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাতের সংকট অনেকখানি দূর হবে। গত জুলাই থেকে দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। তখন চড়া দামের কারণে বৈশ্বিক খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখনো স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে যা দিয়ে খুব বেশি ঘাটতি দূর করা যাচ্ছে না।

 

ইত্তেফাক/ইআ