বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দাওয়াত হোক ভালোবাসার শিল্প

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩:৪৬

মানুষের জীবন থেকে সব কিছুই মুছে ফেলতে পারে, শুধু মুছতে পারে না ভালোবাসার বন্ধন। আর যদি এই ভালোবাসা সৃষ্টি হয় দিন ও কল্যাণকর কাজের জন্য, তাহলে তা পাহাড় থেকেও শক্তিশালী সম্পর্কের রূপ নেয়। তার একটি বড় উদাহরণ হলো রসুল (স.)-এর দাওয়াত ছিল পুরোটাই ভালোবাসার, আর এ ভালোবাসার দাওয়াত পেয়ে জাফর ইবন আবু তালিব শত জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে রসুল (স.) সম্পর্কে বাদশাহ নাজ্জাসির দরবারে বলেছিলেন—‘আল্লাহ আমাদের মধ্যে আমাদেরই এক জনকে রসুলরূপে পাঠিয়েছেন, যাকে আমরা চিনি তার বংশ ও গুণাগুণ সম্পর্কেও আমরা অবহিত। তার ভেতর ও বাহির সম্পর্কে, সত্যবাদিতা, আমানতদারি সম্পর্কেও আমরা জ্ঞাত। (মুসনাদে আহমাদ: ১/২০১) আরো বলেছেন, ‘রসুল (স.) সব সৃষ্টির ওপর, বিশেষত মুমিনদের ওপর বড় দয়াবান ও স্নেহশীল।’ আর রসুলুল্লাহ (স.)-এর দয়া ও ভালোবাসা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে এক জন রসুল এসেছেন, তা তার জন্য কষ্টদায়ক, যা তোমাদের পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়াল’ (সুরা তাওবা:১২৮)।

ভালোবাসা তৈরি হয় নরম কথার মাধ্যমে, কেননা নরম কথা পাথরের চাইতে কঠিন হূদয়কেও কোমল করে দেয়। আর কর্কশ কঠিন কথা রেশমের চাইতে কোমল হূদয়কেও কঠিন করে দেয়। এই জন্য দায়ীর অন্তরে মহব্বত তথা ভালোবাসা ও দরদ সব সময়  থাকতে হবে। আমাদের একটি বিষয় ভালো করে বুঝতে হবে, দাওয়াত হলো একটি আর্ট বা শিল্প। দাওয়াতের ময়দানে ফুটে ওঠে এক জন দায়ীর শিল্প। এ জন্য প্রতিটি দায়ীকে হতে হবে নরম, কোমল, নম্র, ভদ্র। আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা ও হারুন (আ.)-কে পৃথিবীর নিকৃষ্ট তাগুত ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় বলেছিলেন, ‘তোমরা উভয়ে ফেরাউনের কাছে যাও, সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে। এরপর তোমরা তাকে নম্র কথা বলো, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে।’ (সুরা : ত্বা-হা: ৪৩-৪৪)। তাই কাউকে দাওয়াত প্রদানের সময় এ কথা স্মরণে রাখুন যে, আপনি যাকে দাওয়াত দিচ্ছেন তিনি ফেরাউনের চেয়ে নিকৃষ্ট বা খারাপ নন, আর আপনি মুসা বা হারুন (আ.)-এর মতো প্রাজ্ঞ নন। আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় রসুলকে বলেছেন,  ‘আল্লাহতায়ালার রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হূদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হূদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত’ (সুরা আল ইমরান : ১৫৯)। অন্য আয়াতে বলেন, ‘তোমরা পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান কর, হিকমত (প্রজ্ঞা) ও উপদেশপূর্ণ কথার মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন সুন্দরতম পন্থায়।’ (সুরা নাহল: ১২৫)।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রসুল (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নম্র আচরণ হতে বঞ্চিত, সে সকল প্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত।’ (সহিহ মুসলিম) রসুল (স.) আরো  বলেন, ‘নম্রতা ও কোমলতা যে জিনিসেই থাকবে, তা সুন্দর ও সুষমামণ্ডিত হবে আর কঠোরতা যে জিনিসে থাকবে তা কুিসত ও অকল্যাণকর হবে।’ ( সহিহ মুসলিম) তাই দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপ হওয়া উচিত, প্রথমে যাকে দাওয়াত দিতে চাচ্ছি তার সঙ্গে পরিচয়, পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, হাদিয়া দেওয়া, সুখ-দুঃখে তার পাশে দাঁড়ানো, তাকে গুরুত্ব দেওয়া, তার কথা মনোযোগ সহকারে শোনা, তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা, কথার ক্ষেত্রে উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা, বিতর্কে না যাওয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা—এভাবে ধীরে ধীরে তার হূদয়-জমিনকে উর্বর করে তোলা, এক পর্যায়ে দিনের মৌলিক বিষয়গুলো উপস্থাপন করা। আর এই পুরো সময় মুখের কথার চেয়ে বরং নিজের আমল ও আখলাকের মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা।

লেখক: কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব, বাংলাদেশ কওমি ছাত্র পরিষদ

ইত্তেফাক/এসকে