বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইরানের আইআরজিসি’কে কেন সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করা হতে পারে

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:৫২

ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড মূলত একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যা দেশটির ইসলামি শাসন ব্যবস্থার প্রতি ভেতর ও বাইরে থেকে আসা যে কোনো হুমকিকে প্রতিরোধে কাজ করে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিগগিরই এই সংস্থাটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করতে পারে।

কেন সন্ত্রাসী সংগঠন বলা হতে পারে?

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি বলেছেন ইরানের সাবেক মন্ত্রী আলিরেজা আকবরিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর এমন পদক্ষেপ নেয়ার কথা বিবেচনা করছেন তারা। মিস্টার আকবরি ইরানেরই একজন সাবেক মন্ত্রী যিনি পরে যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়েছিলেন।

মিস্টার আকবরিকে যুক্তরাজ্যের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে শাস্তি দেয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন ইরানের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বীকারোক্তির জন্য তাকে নির্যাতন করেছেন।

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছেন ইরান যুক্তরাজ্যে থাকা এমন আরও দশ ব্যক্তিকে টার্গেট করেছে যার মধ্যেই একজন ইরানি সাংবাদিকও রয়েছেন। ওদিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নালেনা বায়েরবক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন উভয়েই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে অনুরোধ করেছেন যাতে করে ইরানি সংস্থাটিকে সন্ত্রাসী তালিকায় ফেলা হয়।

রিভোলিউশনারি গার্ডসের সদস্যরা

এ প্রসঙ্গে তারা সাম্প্রতিক সময়ে ২২ বছর বয়সী তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে পন্থায় বিক্ষোভ দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে সেটিকেও তুলে ধরেছেন। মাহসা আমিনি দেশটির নৈতিকতা পুলিশের হাতে আটকের পর পুলিশী হেফাজতে মারা যান।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় ফেলার পক্ষে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন কিন্তু এটি কার্যকর করতে হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এটি একই পন্থায় অনুমোদন দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ২০১৯ সালেই আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে হেজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুলে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কী?

১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের পর এ বাহিনীটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো মূলত ইসলামি শাসন কাঠামোকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য। এটি দেশটির নিয়মিত সামরিক বাহিনীর বিকল্প হিসেবে কাজ করে আসছিল।

‘এটা হওয়ার কথা ছিলো একটি একক মিলিশিয়া ব্রিগেড কিন্তু পরে একটি ব্যাপক বড় সংগঠনের পরিণত হয়েছে,’ বলছিলেন লন্ডনের থিংক ট্যাংক চাথাম হাউস ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্সের ড. সনম ভিকাল।

রিভোলিউশনারি গার্ডসের কুচকাওয়াজ

আইআরজিসির নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী আছে এবং এর আনুমানিক সদস্য প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার। এমনকি এটিই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনা করে। একই সঙ্গে এর আছে ব্যাপক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এবং প্রতিরক্ষা, প্রকৌশল ও নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে তারা অনেক কোম্পানির মালিক। ফলে এরা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক।

যুক্তরাষ্ট্রের মতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের হাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে। এ ছাড়া বাসিজ প্রতিরোধ বাহিনী নামের আধাসামরিক বাহিনীকেও নিয়ন্ত্রণ করে আইজিআরসি–যারা ইরানের ভেতরে ভিন্নমত দমনের কাজে সহায়তা করে।

রেভ্যুলশনারি গার্ড কী করে?

বাসিজ রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের মাধ্যমে আইআরজিসি দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। গত চার মাস ধরে ব্যাপক সরকার বিরোধী আন্দোলন দমন করতে তারাই মূলত কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে এবারের বিক্ষোভে অন্তত ৫২২ জন নিহত হয়েছে। ‘বাসিজ সহিংসতা দমনে বহু কিছু করেছে এবং অনেককে পিটিয়ে মেরেছে,’ বলছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়াম আলেমজাদেহ।

‘তবে এটি সরকারকে সহায়তা করছেনা কারণ সহিংসতাকে তারা আরও প্রতিবাদের দিকে উস্কে দিয়েছে’। আইজিআরসির একটি বৈদেশিক কার্যক্রম বিভাগ আছে যারা নাম কুদস (জেরুসালেম) বাহিনী। তারা অস্ত্র,অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংগঠনকে সহায়তা করে।

লেবানন ভিত্তিক হেজবুল্লাহ, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া এবং সিরিয়ায় বিভিন্ন তাদের অনুগতরা এসব সহায়তা পেয়ে আসছে। অধ্যাপক আলেমেজাদেহ বলছেন বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের পক্ষে রাখার জন্য কুদস ফোর্স কাজ করে।

যুক্তরাষ্ট্র এই কুদস ফোর্সকে ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তাদের শত শত সেনা সদস্যকে হত্যার জন্য দায়ী করে থাকে।

সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার কী হবে?

সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করা হলে এর সাথে জড়িত থাকা বা একে সমর্থন করাটাই একটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিভিন্ন দেশের এর সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে এবং কোথাও কেউ তাদের অর্থ দেয়ার অনুমোদন পাবে না।

‘এটি ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কারণ দেশের ভেতরে ও বাইরে এর ব্যাপক কর্মতৎপরতা আছে,’ বলছিলেন ড. ভিকাল। ‘এটাই ইরান রাষ্ট্রের বড় অংশ। তাই এটা ভালো লক্ষ্যবস্তু’।

রেভ্যুলশনারি গার্ড নিয়মিত সামরিক বাহিনী থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে।

তবে এটি করা হলে ইরান পাল্টা যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সশস্ত্র বাহিনীগুলোকেও সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করতে পারে। তবে এসব করা হলেও আইআরজিসির কার্যক্রমে এটি কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

‘এটি নতুন কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না কারণ ইতোমধ্যেই অনেক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। তবে এর প্রভাব হবে প্রতীকী,’ বলছিলেন তিনি।

ইত্তেফাক/এফএস/এএএম