শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ভূমিকা কতটুকু

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:০৮

মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে আমানতের সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামগ্রিক বিবেচনায় এবারের মুদ্রানীতিকে সতর্কমূলক বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রতিকূলতার মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে বাজারে অর্থের জোগান আরও কমাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে নীতি সুদহার আরও এক দফা বাড়িয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতির জন্য ‘সতর্ক ও সংকুলানমুখী’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের জন্য এমন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদানের পর এটাই তার প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা। 

এ পরিবর্তনের ফলে একদিন মেয়াদি রেপোর সুদহার ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৬ শতাংশ হয়েছে। আর রিভার্স রেপো হার আগের ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের আমানতের ওপর বেঁধে দেওয়া সুদহার তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতের সুদহার নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে। এছাড়া ভোক্তাঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। বর্তমানে ব্যাংকের সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। ভোক্তাঋণের সুদহার বাড়ানোর ফলে ব্যাংকগুলো তা ১২ শতাংশ পর্যন্ত করতে পারবে। বিপরীত দিকে শিল্পঋণসহ অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে সুদহারের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন, বিনিময় হারের চাপ নিয়ন্ত্রণ, সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মুদ্রানীতিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যাংক রেট আগের মতোই ৪ শতাংশে রাখা হয়েছে। তবে পরে আলাদাভাবে বিশেষ রেপো হার ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করে  বলেছেন, ‘আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের এলসি খোলায় পণ্যের যে দাম ছিল, তার চার ভাগের এক ভাগে এলসি খুলেছেন গ্রাহকরা। এটি ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। বাকি তিন ভাগ অর্থও কোনো না কোনো জায়গা থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। এসব বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে, আরও কমে আসবে।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহারে ক্যাপের বিষয়ে তার অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। যদিও গত তিন মাস ধরে একটি অঘোষিত নীতি ছিল, কনজ্যুমার ঋণে ৯ শতাংশের ওপরে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দেওয়া যেতে পারে। এটা একটি ইতিবাচক দিক। ডিপোজিট রেটের ওপরে ফ্লোর উঠিয়ে দেওয়াও ইতিবাচক দিক। এতদিন ব্যাংকাররা ফিক্সড ডিপোজিটে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর ফিক্সড ডিপোজিটে আগ্রহ বাড়বে, যা ডিপোজিট গ্রোথকে বাড়াতে সহায়তা করবে। ফলে ব্যাংক খাতে যে তারল্য সংকট রয়েছে, তা পুরোপুরি কেটে না গেলেও অনেকটা সহায়ক হবে। এতে ব্যাংকারদের খরচ হয়  তো কিছুটা বাড়বে। কিন্তু ব্যাংকাররা এর থেকে অনেক বেশি রেট নিচ্ছেন। কলমানি রেট, ইন্টারব্যাংক রেপো রেট ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত সার্বিক অর্থনীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। সার্বিকভাবে বলা চলে, মুদ্রানীতির মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সুতরাং, নতুন মুদ্রানীতি বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেই। একটাই আছে—ভোক্তা ঋণে (ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ঋণ, আবাসন ঋণ, শিক্ষা ঋণ প্রভৃতি) সুদহার ৩ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ভোক্তা ঋণ খুব বেশি নয়। কাজেই এটি মূল্যস্ফীতির ওপরে খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। কিছু পদক্ষেপ আছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন—সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে সরাসরি ঋণ দিচ্ছে, এর ফলে মানি ক্রিয়েশন হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার কথা বলেছে যে, মূল্যস্ফীতি যেহেতু সাপ্লাই সাইডের, তাই রিফাইন্যান্স অর্থাৎ পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে সরবরাহকে বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যেখানে বিদেশি মুদ্রার অভাবে এলসি খোলা যাচ্ছে না, জ্বালানি গ্যাসের অভাবে কারখানা চালানো যাচ্ছে না, সেখানে উৎপাদনশীলতা আটকে গেলে সেটা ক্রেডিট দিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ানো হবে।

বর্তমানে ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যাংকের কাছে ঋণ দেওয়ার মতো তহবিল কমে হয়েছে ৬ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর কাছে আছে মাত্র ৬৪৬ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাজারে টাকার জোগান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের জোগান বৃদ্ধি করা হবে। সরকারি ঋণও আগের চেয়ে বাড়বে। এ দিয়েই চলতি অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর সরকারের সঙ্গে সংগতি রেখে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। যদিও ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, আমানতের প্রবৃদ্ধি কমায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে টাকার সংকট মেটাবে। এতে ডলার-সংকট আরও বাড়বে। তবে এ মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতির সংকটের বড় ধরনের অগ্রগতির আশা কম। কারণ মূল্যস্ফীতি, ডলার ও টাকার সংকট। এসবই এখন অর্থনীতির প্রধান তিন সমস্যা।

মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্য রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মেয়াদ ও তীব্রতা, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদহার বৃদ্ধি এবং চীনে করোনার নতুন প্রভাব ও তীব্রতার ওপর। যদি এসব পরিস্থিতির উন্নতি হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ইত্তেফাক/এমএএম