শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে দারিদ্র্য নিরসন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে : বিশ্বব্যাংকের এমডি

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:০৪

‘বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাসসহ শিশু ও গর্ভকালীন ও প্রসবজনিত মৃত্যুর হার হ্রাসে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশের আগামীর উন্নয়নে এখন দারিদ্র্য হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষা খাত নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না।’ ঢাকা সফররত বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশনস) অ্যাক্সেল ভ্যান ট্রটসেনবার্গ এ কথাগুলো বলেছেন। বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাংকের ৫০ বছরের অংশীদারিত্ব উদযাপন করতে গতকাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাংকের দৃঢ় সহায়তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

গতকাল রবিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আরো বক্তব্য রাখেন, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইজার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শরিফা খান, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদৌলায়ে সেক।

ভ্যান ট্রটসেনবার্গ বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশ অচিন্তনীয় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কোভিড-১৯, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জের সময়ে আমরা বাংলাদেশকে এর উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে তিনটি বিষয় মুখ্য ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে ভ্যান ট্রটসেনবার্গ বলেন, এর একটি হলো মানব সম্পদে বিনিয়োগ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় বিশ্বের অন্যতম দরিদ্রতম দেশ থেকে ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। 

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রথম উন্নয়ন সহযোগীদের অন্যতম হিসেবে এই যাত্রায় অংশীদার হতে পেরে গর্বিত এবং আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখেছি যে, উন্নয়ন কীভাবে কাজ করে। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে এখন মানব সম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে করতে হয়। এর প্রতিদানও ফিরে আসে। দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে শিক্ষার বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটা প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কারিগরি শিক্ষা—সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।’ আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অবশ্যই দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে মানব সম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্ব দিতে হবে। এ সময় তিনি বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, স্কুলে মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি, প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠান শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান ট্রটসেনবার্গ বলেন, উদ্বাস্তু সমস্যা এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। ভেনিজুয়েলাতে ৫৫ লাখ মানুষ এখন উদ্বাস্তু। ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে ৫৫ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৮৮ লাখ মানুষ। তাছাড়া জর্ডান, লেবালনেও লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু। বিশ্বব্যাংকও তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের সহায়তার পরিমাণ সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের উন্নীত করা হয়েছে। এর আগে এই খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ছিল। আমরা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানাই যাতে ভূরাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়ে আসে। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের বিশ্বব্যাংক সরকারি কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সবাই আশা করছি তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু বর্তমান মিয়ানমারের রাজনৈতিক অবস্থা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক কীভাবে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে পারে—সে বিষয়ে সংস্থাটি কাজ করছে বলে জানান তিনি।

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে বিশ্বব্যাংক ৩৫৬টি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, পদ্মা সেতুর প্রকল্প তার মধ্যে একটি ছিল। প্রকল্প থেকে অর্থায়ন ফিরিয়ে নেওয়ার উদাহরণ বিশ্বের অন্য দেশেও হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পে অর্থায়ন না করলেও বাংলাদেশে প্রতি বছর বিশ্বব্যাংক তার অর্থায়ন বাড়িয়েছে। আগে প্রতি বছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও গত ২ বছরে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দীর্ঘমেয়াদে সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তাবয়নে বিশ্বব্যাংক গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

এর আগে আলোচনা সভায় ইআরডি সচিব শরিফা খান বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের সুদ হার বেড়ে যাচ্ছে। গড়ে এখন ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করতে হয়। সুদের হার হ্রাসে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্যান ট্রটসেনবার্গ বলেন, বিশ্বব্যাংক এখনো সবচেয়ে কম সুদে অর্থায়ন করে থাকে। এই তহবিলের আকার আরো  বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দেওয়া হবে কী না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি কিছু না বলে উল্লেখ করেন, মূলত মধ্য আয়ের ৪০ শতাংশ এবং নিম্ন আয়ের ২০ শতাংশ এ ধরনের সহায়তা নিয়ে থাকে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্বল্প সুদে আইডা তহবিল এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে ঋণসংকটে থাকা দেশগুলোকে সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, আইডা তহবিলের গ্রহীতা ৭৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ছয়টি দেশ ঋণ সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে শ্রিলঙ্কা ও জাম্বিয়া রয়েছে। তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায় বিশ্বব্যাংক সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যখন আর কোনো আলো থাকবে না তখনো বিশ্বব্যাংক সদস্য দেশগুলোর পাশে থাকবে’।

তিনি অর্থমন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজারসহ বাংলাদেশে ও বিশ্বব্যাংকের ৫০ বছরের অংশীদারিত্ব উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি তুলে ধরার এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন এবং একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, স্বাধীনতার পর দেশের জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশ ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আমাদের দারিদ্র্যের হার কমে ২০ শতাংশ হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার হয়েছে এবং গড় আয়ু বেড়ে ৭৩ বছর হয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু। তবে মডার্ন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ হাসিনা এটা নিয়ে কারোর প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক অনেক সহায়তা করছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের পরবর্তী টার্গেট ২০৩১ সালে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হবে। আর ২০৪১ সালে স্মার্ট ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ হবে।

পরে এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সাবেক মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, বিশ্বব্যাংকের মালটি লেটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সির (মিগা) ভাইস প্রেসিডেন্ট জুনায়েদ কামাল, অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর, মেট্রোপলিটান চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর।

ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, স্বল্প মেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে এর একটি হলো সুদ হার নীতি। রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের দুরবস্থা। তিনি বলেন, জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে যা বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় কম। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে চাই কিন্তু নিজস্ব সম্পদ আহরণে গুরুত্ব দিচ্ছি না। এ খাতে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার ছাড়া এই অর্জন করা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতেও সংস্কার করতে হবে। এটা শক্ত হাতেই করতে হবে। কাউকে সুবিধা দিয়ে, বৈষম্য রেখে সংস্কার করলে সুফল পাওয়া যাবে না। এছাড়া শ্রমিকের জীবন মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানউন্নয়নে গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য হয়। ১৯৭২ সালে নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রথম প্রকল্প হাতে নেওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ, কৃষি ও শিল্পের পুনঃপ্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণ ও বিদ্যুৎ খাতের সহায়তার জন্য ৫ কোটি ডলারের জরুরি পুনরুদ্ধার ঋণ দেওয়া হয়। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক চারটি প্রকল্প পুনরায় চালু করে যা স্বাধীনতার আগে অনুমোদিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ অতিক্রমে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) আওতায় অনুদান, সুদবিহীন ঋণ এবং নমনীয় সুদে ঋণ হিসেবে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে ৫৩টি চলমান প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৫৩০ কোটি ডলারের অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সর্ববৃহৎ আইডিএ কর্মসূচির বাস্তবায়ন চলছে এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার।

 

 

ইত্তেফাক/ইআ