শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দেড় লাখ বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য নেই 

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:০৪

বৈধ অস্ত্রের সঠিক পরিসংখ্যান নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। আর এ কারণেই দিনদিন বাড়ছে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার। এসব অস্ত্র দিয়ে চাঁদাবাজি, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ভয়ভীতি দেখানো, আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, জমিজমার বিরোধ ও অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের ৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে। সারা দেশে প্রায় ২ লাখ বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখায় ৪৪ হাজার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের হিসাব রয়েছে। প্রায় দেড় লাখ বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য পুলিশের বিশেষ শাখায় নেই। এমন পরিস্থিতিতে বৈধ অস্ত্রধারীদের ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরির কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আসন্ন নির্বাচনের আগেই এই তালিকা তৈরির কাজ শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে লাইসেন্স বা অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রায় ২ লাখ বৈধ অস্ত্র রয়েছে। তবে এসব বৈধ অস্ত্রের মালিকদের পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ডিলারের কাছে সংরক্ষিত নেই। তাই অস্ত্রের ডাটা তৈরিতে সিআইডি দেশের ৬৪ জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। আর এ জন্য দেশের সব জেলার সিআইডি অফিসে বৈধ অস্ত্রের মালিকরাও অস্ত্রের নমুনা দিতে পারবেন। প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্রেরই কিছু স্বতন্ত্র কোড আছে। এটা অনেকটা মোবাইল ফোনের আইএমইআই-এর মতো। এই কোড থেকেই বোঝা যাবে অস্ত্রের ধরন কী। নতুন করে কোনো অস্ত্র কিনলে এখন থেকে সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্ত্রের কোড সিআইডিকে দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে।

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে। সেগুলো পূরণ হলেই এক জন নাগরিক আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর জীবনের বাস্তব ঝুঁকি থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন। ‘শর্ট ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স ন্যূনতম ৩০ বছর এবং ‘লং ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৫ বছর হতে হবে। বয়স ৭০ বছরের নিচে হতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই আয়করদাতা হতে হবে, বছরে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। অনুমতি পেলে আবেদনকারী অস্ত্র আমদানি করে আনতে পারেন অথবা দেশীয় বৈধ কোনো ডিলারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

গত ১৫ জানুয়ারি গুলশানে একটি বিকাশের দোকান থেকে ৭৫ হাজার টাকা বিকাশ করে টাকা না দিয়ে আরিফ নামে এক ব্যক্তি চলে যেতে চাইলে ব্যবসায়ীরা তাকে আটক করেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি আবদুল ওয়াহিদ ওরফে মিন্টু ও তার লোকজন আরিফকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীরা বাধা দেন। এ সময় মিন্টু তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এতে দুই জন আহত হন। জানা যায়, ২০১৬ সালে মিন্টুর অস্ত্রের লাইসেন্স করা হয়। মেয়াদ শেষে ২০২১ সালে লাইসেন্সটি নবায়ন করেন তিনি। পুলিশ অস্ত্রটি জব্দ এবং মিন্টুকে গ্রেফতার করে।

অন্যদিকে গত বছর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যুবলীগের আহ্বায়ক ও শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজালাল মজুমদারের ওপর কথিত যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান জুয়েলের নেতৃত্বে এক দল সন্ত্রাসী অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলায় চেয়ারম্যানের গাড়িচালক আমজাদ হোসেন আহত হন। ঐ ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঐ ঘটনায় জুয়েলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে জমি দখলের চেষ্টা করে তিন ভাই। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। তাদের অস্ত্রগুলোও লাইসেন্স করা ছিল বলে থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কারো বিরুদ্ধে বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জানা গেছে, ২০২১ সালে বৈধ অস্ত্রের ডাটাবেজ তৈরির কাজ হাতে নিয়েছিল অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মূলত বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে আবারও ডেটাবেইজ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রের ব্যবহারে নীতিমালা থাকলেও তার তোয়াক্কা করছেন না অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী। তবে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এই তালিকা তৈরির কাজ শেষ করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে।  

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) হালনাগাদ বৈধ অস্ত্রের তথ্যভান্ডার ফায়ার আর্মস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএএমএস) সূত্র মতে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৪৪ হাজার ১০৪টি অস্ত্রের লাইসেন্সের তথ্য এতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৭৭৭টি অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে ব্যক্তির নামে। বাকি ৩ হাজার ৩২৭টি অস্ত্র রয়েছে আর্থিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে— একনলা ও দোনলা বন্দুক, শটগান, পিস্তল, উজিগান, রিভলবার ও রাইফেল। এসব অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। এক জনের নামে একাধিক অস্ত্রের লাইসেন্সও আছে। তবে সারা দেশে বৈধ অস্ত্র রয়েছে আরো অনেক বেশি যার সঠিক তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট শাখায়।

এর কারণ হিসেবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে পুলিশের কাছে একটি তদন্ত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ঐ চিঠিতে মূল আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানা সঠিক কি না এবং তিনি লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন কি না তা তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশনা আসে। এক্ষেত্রে অনেক প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি থানার ওসিদের ম্যানেজ করে রিপোর্ট নিজেদের পক্ষে নেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বিপক্ষেও প্রতিবেদন জমা পড়ে। সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে তদবির করে অনেকে লাইসেন্স পেয়ে যান। এরপর আবেদনকারী অনুমোদন পাওয়া অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী অনুমোদিত দোকান থেকে কিনে নিজের জিম্মায় নেন। এক্ষেত্রে পুলিশ অনেকটা অন্ধকারেই থাকে। তবে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে লাইন্সেপ্রাপ্তদের তালিকা সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে নামের তালিকা ধরে ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বোচ্চ শীর্ষ পর্যায়ের এক জন কর্মকর্তা বলেন, লাইসেন্সকৃত অস্ত্র কেউ অপব্যবহার করছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী বৈধ অস্ত্র পেয়েছেন কি না তাও আমরা তদন্ত করছি। লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিয়ে চাঁদাবাজি-প্রভাব বিস্তারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। কারো বিরুদ্ধে বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

ইত্তেফাক/ইআ