বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংকট ও সমাধানের সেতুবন্ধন ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ২০:৫৯

একজন সাংবাদিক যখন নিজেই শিক্ষার্থী, তখন সে পড়াশোনার পাশাপাশি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট এবং সমাধানের সেতুবন্ধন হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করে থাকেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের মানোন্নয়ন কিংবা সৌন্দর্যের বার্তা জাতির কাছে উপস্থাপন করতেও তার ভূমিকা থাকে অনস্বীকার্য। তিনিই একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিক। 

দেশে সর্বপ্রথম ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হামিদুজ্জামান রবিকে সভাপতি ও দৈনিক পূর্বদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম বুলবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি - রাবিসাস। রাবিসাসের মাধ্যমেই সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

গণমাধ্যমের ক্যাম্পাস প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। বলা বাহুল্য, এই সাংবাদিক সমিতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে কাজ করে। প্রয়োজনীয় শর্তাবলী মেনে এই সমিতির সদস্য হতে পারেন সাংবাদিকতায় আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো বিভাগের শিক্ষার্থী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবৈতনিক বা নামমাত্র বেতন পাওয়া এই পেশাকে ছাত্রজীবনে শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্ন হিসেবে মনে করে পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা করছেন নির্ভীক, দায়িত্বশীল এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক সংবাদের পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকারের বিষয় নিয়েও গুরুত্বসহকারে সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সৌন্দর্য হলো সততা এবং সাহসিকতা। সংকট কিংবা সমস্যা নিয়ে লেখালেখি করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মিডিয়া হাউজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ক্যাম্পাসের অন্যান্য রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ছাত্রসংগঠনগুলোর সহকর্মীদের সহযোগিতায় এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় খুব সহজেই।

দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; এমনকি কলেজ পর্যায়ে ঢাকা কলেজসহ প্রায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত সাংবাদিক সংগঠন গড়ে উঠেছে।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর, মানবজমিন, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নয়া দিগন্ত, কয়েকটি স্বনামধন্য অনলাইন পোর্টাল, টেলিভিশন মিডিয়ার অনলাইনসহ অন্যান্য মিডিয়া হাউজগুলো ক্যাম্পাস প্রতিনিধি বা সংবাদদাতা দিয়ে থাকেন।

ইতোমধ্যেই দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক। তৈরি হয়েছে বড় একটি নেটওয়ার্কের। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের মেলবন্ধনের জন্য আয়োজন করা হয়েছে ন্যাশনাল ক্যাম্পাস জার্নালিজম ফেস্ট; সেখানে সারাদেশের ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা মিলিত হোন প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনায়।  

ক্যাম্পাস সাংবাদিক হতে হলে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করা জরুরি নয়। বরং ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের মধ্যে অধিকাংশই অন্যান্য বিষয়ে যেমন, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, গণিত, ইংরেজি এবং বাংলাসহ অন্যান্য বিভাগে পড়াশোনা করেও সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে নানা ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে প্রথিতযশা সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদরা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর ছাত্রাবস্থা থেকেই সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হয়। যার ফলে স্নাতক শেষ করার পর সহজেই মিডিয়া হাউজগুলোতে চাকরি পাওয়ার ভালো সুযোগ আছে এতে। অভিজ্ঞ এবং ইংরেজিতে দক্ষ হতে পারলে আন্তর্জাতিক  মিডিয়া যেমন বিবিসি, রয়টার্সের মতো জায়ান্ট মিডিয়া হাউজেও চাকরি পাওয়ার সুযোগ মেলে। এছাড়াও কমিউনিকেশন, লিডারশীপ এবং অরগানাইজেশানাল স্কিলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সব দক্ষতার বিকাশ ঘটে এতে।

সর্বোপরি, নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য, সংকট এবং তার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করার জন্য একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিক তার প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল মুখপাত্র হিসেবে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন।

লেখক: যোবায়ের ইবনে আলী, বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা, দৈনিক ইত্তেফাক ও দপ্তর সম্পাদক, হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি, দিনাজপুর।

ইত্তেফাক/এআই