বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্বর্ণ পাচারে ইউএই সিন্ডিকেটের পছন্দের রুট চট্টগ্রাম!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:০৬

অবৈধভাবে স্বর্ণ পাচারে এখনো আরব আমিরাতভিত্তিক সিন্ডিকেটের পছন্দের রুট চট্টগ্রাম। আবারও অভিনব কায়দায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় পৌনে দুই কেজি স্বর্ণ নিয়ে চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশের সময় ধরা পড়েছেন মোহাম্মদ জিয়াউল হক নামের এক পাচারকারী। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) ও বিমানবন্দর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাচারকারীর স্বর্ণ উদ্ধারে নগরীর হাজারি গলিতে অভিযান চালায়। কারণ দুবাই থেকে আসা পাচারকারী ব্যক্তি তার পাচারের স্বর্ণের মোট ১ কেজি ৪২৯ গ্রাম গলিয়ে গেঞ্জি ও অন্তর্বাসের মধ্যে প্রলেপ দিয়ে তা পরিধান করে এসেছিলেন। পাচারকারীর এই কৌশলটি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল অভিনব। এছাড়া দুবাই এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে আসা যাত্রীটির কাছে আরো পাওয়া যায় ২৩৩ গ্রাম ওজনের দুটি স্বর্ণের বার এবং ১০০ গ্রাম ওজনের কিছু স্বর্ণালংকার।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দরে নিয়োজিত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ভিত্তিক একটি শক্তিশালী স্বর্ণ পাচারকারী সিন্ডিকেট স্বর্ণ পাচারে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে থাকে। তবে স্বর্ণ পাচারে ঐ সিন্ডিকেটের কাছে সবচেয়ে পছন্দের রুট হচ্ছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তারা বলেন, ২০২১ সাল থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত গত প্রায় তিন বছরে ধরা পড়া স্বর্ণের চালানসমূহ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। সিন্ডিকেটটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নিরাপত্তা চ্যানেল অতিক্রমে প্রতিনিয়ত নানা অভিনব কৌশল অবলম্বন ও এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছে। তার মধ্যে স্বর্ণ গলিয়ে পরিধেয় কাপড়ে তার প্রলেপ দিয়ে গায়ে চড়িয়ে নিয়ে আসার কৌশলটি আগে দেখা যায়নি। এই সব স্বর্ণ কাপড় থেকে বিযুক্ত করতে অনেক সময় লেগেছে বলেও একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান। গত মঙ্গলবার এখানে ধরা পড়া স্বর্ণের আর্থিক মূল্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৯০ টাকা।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক উইং কমান্ডার তাসনিম আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে স্বর্ণ পাচারকালে যেসব ব্যক্তি স্বর্ণসহ ধরা পড়ছেন, তাদের অধিকাংশই হচ্ছে বাহক বা ক্যারিয়ার। মূল সিন্ডিকেটের পাচারকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ক্যারিয়াররা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে অবৈধ স্বর্ণ বাইরে বের করতে পারলে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক পায় বলেই ধারণা করা হয়। তিনি জানান, বিমানবন্দরে ঘোষণা দিয়ে প্রতিটি ১০০ গ্রাম ওজনের মোট ২০০ গ্রামের দুটি স্বর্ণবার মোট ৪০ হাজার ১২০ টাকা শুল্ক পরিশোধ করে দেশে আনা যায়। অনেক যাত্রী এভাবে আনছেন। 

এদিকে বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২১ সালের ৯ অক্টোবর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সংস্থার কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক কর্মচারীকে আটক করে তার কাছ থেকে ৮০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন। দেশে যার বাজারমূল্য ছিল ৫ কোটি টাকা।

২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর এনএসআই ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যৌথ অভিযানে মোহাম্মদ সোহেল নামের স্বর্ণ চোরাচালানি হিসেবে এক অভিযুক্তকে আটক করে চার কেজি অবৈধ স্বর্ণ উদ্ধার করেছিলেন।

২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের ভেতরে বাংলাদেশ বিমানের গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট অঞ্চলে বিমানের চাকা কেটে তার ভেতর থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ৪৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। একই বছরের ১ জুন আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে এয়ার এরাবিয়ায় চড়ে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে গোয়েন্দারা উদ্ধার করেন ৩৪টি স্বর্ণের বার। একই বছর ১৬ জুন গোয়েন্দারা আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে উদ্ধার করেন ১ কেজি ২৪৪ গ্রাম অবৈধ স্বর্ণ এবং ৯ কেজি সিসা নামের মাদক। ২০২২ সালের ১২  নভেম্বর দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের একটি যাত্রী আসনের নিচে তল্লাশি চালিয়ে শুল্ক গোয়েন্দারা উদ্ধার করেন ৬ কেজি ৫২৪ গ্রাম ওজনের ৫৬টি স্বর্ণ বার। যার মূল্য ছিল ৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এগুলোর কোনো দাবিদার মেলেনি বলেও কর্মকর্তারা জানান।

ইত্তেফাক/ইআ