চট্টগ্রামে সরকারি বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট প্রকট। বিগত অনেক বছর যাবত স্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগের মাধ্যমে জনবলের ঘাটতি সামাল দিতে হচ্ছে। এদিকে কম বেতনে এসব লোকের কারণে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানিও বেড়েছে। টাকা না দিলে সেবা মিলে না এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব লোক মাসিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি বেতন পান না। অস্থায়ী এসব লোকের কারণে সরকারি অফিসের অনেক গোপনীয়তাও প্রকাশ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রামে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়াসা, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, চমেকসহ সরকারি হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন অসংখ্য লোক সেবা নিতে ভিড় করছে। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল সংকটে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত কয়েক বছর যাবত সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদনও রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান টেন্ডার প্রক্রিয়া ও সংস্থার গাইড লাইন অনুসারে লোক নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ করছে না। কারণ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিবিএ’র কর্মকাণ্ডে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে সরকারিভাবে আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পিডিবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘এটা সরকারের কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে লোক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেরি হচ্ছে বা জটিলতা দেখা দিয়েছে। সাময়িক সংকট কাটানোর জন্য আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োজিত করা হয়। তবে এসব লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে।’
চমেক হাসপাতালসহ চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সংকটে হাসপাতালের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতাসহ সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অবসরে যাওয়ার পর শূন্য পদ আর পূরণ হচ্ছে না। এতে জনবল সংকট প্রকট হয়েছে। গত কয়েক বছর যাবত আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগ করে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রহরী, নিরাপত্তা কর্মী, ওয়ার্ড বয়,পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে জনবল সংকটে রোগীদের সেবা পেতে হয়রানি পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে ১৯৩ জন লোক আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লোক নিয়োগ করা হয়েছে। আনসার সদস্যদের মাধ্যমে ওয়ার্ডের নিরাপত্তার কাজ করানো হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় লোক নিয়োজিত করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের বেতন অত্যন্ত কম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে এত কম বেতন নিয়ে সংসারের ব্যয় নিরসন সম্ভব নয়। তার পরও অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে জীবিকার তাগিদে কাজ করে যাচ্ছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সেবাগ্রহীতার মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে। এসব লোকের বিরুদ্ধে অনেক সেবাগ্রহীতা হয়রানিরও অভিযোগ করে থাকেন। কারণ সেবা নিতে তাদের বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবলের প্রকট সংকট রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ে ৩১৫ জন ও দৈনিক ভিত্তিতে ১৫ জন লোক নিয়োজিত রয়েছে। কম্পিউটার অপারেটর, দারোয়ান, পিয়ন, গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ নানা পদে আউটসোর্সিংয়ের জনবল নিয়োজিত রয়েছে। অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ কম্পিউটার অপারেটরের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা প্রকাশ পাওয়া অভিযোগও উঠেছে। কারণ স্থায়ী কর্মচারী না হওয়ায় তাদের কাজে জবাবদিহির সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানের সংস্থাপন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আউটসোর্সিংয়ের লোকদের বিভিন্ন গ্রেড অনুসারে সরকারি নীতিমালা অনুসারে বেতন প্রদান করা হয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণ বিভাগগুলোতে আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োজিত রয়েছে। বিদ্যুৎ বিল তৈরি, রিডিং সংগ্রহ ও বিল পৌঁছানোর কাজ এসব লোকের মাধ্যমে করা হচ্ছে। পিডিবির আউটসোর্সিংয়ের লোকদের মাসিক চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়। তাদের রিডিং সংগ্রহ ও বিল পৌঁছানোর জন্য প্রতি গ্রাহক বাবদ ৪ টাকা হারে প্রদান করা হয়। সেই হিসাবে মাসে তাদের ৮/১০ হাজারের বেশি আয় হয়ে থাকে। এই কাজ করতে গিয়ে গ্রাহক হয়রানিরও অভিযোগ পাওয়া যায়। টেম্পারিং করে মিটারের রিডিং কমিয়ে বিল কম দেখানোর অভিযোগ আসে। এছাড়া চট্টগ্রাম ওয়াসায়ও আউটসোর্সিংয়ে প্রচুর লোক নিয়োজিত আছে।
