শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রাঙ্গা জাপারই কেউ নন কিন্তু তাদের চিফ হুইপ

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০৮:০৪

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও অব্যাহতি দিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল গত বছরের ২৮ অক্টোবর। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সেই থেকে রাঙ্গা জাপার কেউ নন। তবে এখনো সংসদের ‘বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ’ পদে বহাল রয়েছেন তিনি। ফলে, সংসদ ভবনে থাকা বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের অফিস ব্যবহারের পাশাপাশি তিনি প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধাও যথারীতি ভোগ করছেন। এমনকি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে তিনি অধিবেশন কক্ষে বিরোধীদলীয় নেতার ঠিক পেছনের আসনেই বসছেন। তিনি যাদের চিফ হুইপ, অথচ তিনি সেই দলের কেউ নন—এ নিয়ে জাপার অভ্যন্তরেও, বিশেষ করে দলটির সংসদ সদস্যরা অস্বস্তিতে ভুগছেন।

মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দল থেকে বহিষ্কারের দুই দিন পর, অর্থাৎ গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাঙ্গাকে বাদ দিয়ে দলের কো-চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। ঐদিন সংসদ ভবনে দলীয় এমপিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে দলের গঠনতন্ত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তিনি ফিরোজ রশীদকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানিয়ে ঐদিনই সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জাপার পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়। তবে, এটি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘উনি (রাঙ্গা) আমাদের দলের কেউ নন, দল থেকে বহিষ্কৃত। ওনার পরিবর্তে অন্য একজনকে (কাজী ফিরোজ রশীদকে) বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করার জন্য আমরা স্পিকারকে চিঠিও দিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। বিষয়টি নিয়ে আমরা বেকায়দা অবস্থায় আছি। যিনি (রাঙ্গা) বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ, কিন্তু তিনি আমাদের দলের কেউ নন, এমনকি দলের প্রাথমিক সদস্যও নন—কী বিশ্রি অবস্থা! এটা তো নজিরবিহীন। উনি আমাদের দলের সদস্য নন বলেই সমপ্রতি দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকেও (গত ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত) তাকে রাখা হয়নি।’

নিয়ম অনুযায়ী, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের হুইপিং করে থাকেন। অধিবেশন চলাকালে নানা কাজে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব, বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা, শোক প্রস্তাবের আলোচনা কিংবা যে কোনো আলোচনায় বিরোধী দল থেকে কোনদিন কারা বক্তব্য রাখবেন—সেই তালিকা সংসদের চিফ হুইপ (সরকারি দলের চিফ হুইপ) হয়ে স্পিকারের কাছে যায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের মাধ্যমে। বর্তমানে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা চলছে। তাহলে প্রস্তাবের ওপর বিরোধী দলের সদস্যরা কে কোনদিন বক্তব্য রাখবেন—সেটির তালিকা কীভাবে করা হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘পুরো বিষয়টা আসলে বিব্রতকর। উনি (রাঙ্গা) নিজ থেকে এসে আমাদের দলের এমপিদের কাছ থেকে নাম চান, এমপিরা কেউ কেউ কৌশলে তাকে এড়িয়ে চলছেন, কেউ লজ্জায় পড়ে তার কাছে নাম লেখাচ্ছেন। এই আর কী।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে মসিউর রহমান রাঙ্গার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পরিবর্তনের জন্য জাপার পক্ষ থেকে যেই চিঠিটা আমাকে দেওয়া হয়েছে, সেটির কার্যক্রম পেন্ডিং (মুলতুবি) রাখা হয়েছে। যেহেতু জাপার চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের দলীয় কার্যক্রমের ওপর আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেই কারণেই এটা পেন্ডিং রয়েছে। বিষয়টি আদালতে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

প্রসঙ্গত, দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধার একটি মামলায় গত বছরের ৩০ অক্টোবর জি এম কাদেরের ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ মাসুদুল হক। আইনি পদক্ষেপের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে, রাঙ্গাকে যেদিন (গত বছরের ২৮ অক্টোবর) দল থেকে বহিষ্কার করেন জি এম কাদের, তখন তার ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তবে রাঙ্গাকে বাদ দিয়ে ফিরোজ রশীদকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করার জন্য পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদের নিজে স্বাক্ষর করে যেদিন (গত বছরের ৩১ অক্টোবর) স্পিকারকে চিঠি দেন, তখন কিন্তু তিনি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ছিলেন।

গত ১৯ জানুয়ারি সংসদ ভবনে জাপার সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরের কক্ষে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন রাঙ্গা। তিনি জি এম কাদেরের পা ছুঁয়ে সালাম করে ক্ষমা চান। এ সময় জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ; কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ দলের কয়েক জন এমপি উপস্থিত ছিলেন। তখন জি এম কাদের বলেছিলেন, ‘ও (রাঙ্গা) আমাকে নিয়ে মিডিয়াতে অনেক কথা বলেছে, ওর বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তো প্রেসিডিয়ামের সভায় হয়েছে। কাজেই এখানে কয়েক জন বসে তো সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডিয়াম সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ জানা গেছে, রাঙ্গাকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে ঐদিন সংসদীয় দলের বৈঠকেও কথা হয়, সেদিনের বৈঠকে সভাপতিত্বকারী রওশন এরশাদও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য, উপজেলা দিবস উপলক্ষ্যে গত বছরের ২৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে রওশন এরশাদের অনুসারীদের আয়োজিত আলোচনাসভায় জি এম কাদের সম্পর্কে অশালীন নানা মন্তব্য করেছিলেন রাঙ্গা।

এদিকে, ‘দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না’—এমন কারণ দেখিয়ে তার পরিবর্তে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার জন্য গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল জাপার পার্লামেন্টারি পার্টি। দলের ২৬ জন এমপির মধ্যে ২৩ জন এতে সম্মতি দিয়ে নিজেদের স্বাক্ষর সংবলিত চিঠিও দেন স্পিকারকে। এটি কার্যকর না হলেও এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আপাতত আর আপত্তি তুলছেন না জাপার কেউ।

ইত্তেফাক/ইআ