রোববার, ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মেয়াদের অর্ধেক পার করলেন বাইডেন

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৩:৫৯

মেয়াদের প্রথম অর্ধেক পার করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার প্রশাসন এ সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে কতগুলো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গোটাতে শুরু করেছিল। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সবাই আশা করেছিল তিনি তার পূর্বসূরির পথে না হেঁটে তার দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন। প্রত্যাশা অনুযায়ী তার প্রশাসন কাজ শুরু করে। রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করতে হলেও লক্ষ্যচ্যুত হননি বাইডেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউক্রেন যুদ্ধকে দেখা হচ্ছে সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে।

রাশিয়া ও চীন বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন প্রাধান্য পাচ্ছে। রাশিয়া যেন ইউরোপে আগ্রাসনের বিস্তার ঘটাতে না পারে সেজন্য পশ্চিমা মিত্রদের নতুন করে ঐক্যবদ্ধ করেছে বাইডেন প্রশাসন। অন্যদিকে চীনের আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে ঠেকাতে ইন্দো-প্যাসিফিকে তৈরি করেছে নয়া জোট। ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও বাইডেন তাতে ফেরত এসেছেন। তবে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো পরমাণু চুক্তির উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ২০১৫ সালে করা সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প অবশ্য বরাবরই ঐ চুক্তির বিরোধী ছিলেন। বাইডেন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জোরাল কোনো পদক্ষেপ নেননি। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে সহায়তা করছে এমন খবর প্রকাশের পর তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার সম্ভবনা কমে গেছে। বাইডেনের সব উদ্যোগই যে খুব সফল হয়েছে তা নয়। দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মাথায় তিনি আফগানিস্তান থেকে সৈন্য ফিরিয়ে এনেছেন। অনেকে মনে করে এক্ষেত্রে তার প্রশাসন তাড়াহুড়ো করেছে। শুরু থেকে তিনি বলে এসেছেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তার পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ। এ কারণে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাইডেন প্রশাসনকে অনেক অবাঞ্ছিত সমঝোতা করতে হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও অনুমেয় সম্পর্ক রাখার ঘোষণা দিয়েই বাইডেন প্রশাসনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার সঙ্গে একটা সম্পর্ক রেখে প্রধান প্রতিপক্ষ চীনকে চাপে রাখা। ২০২১ সালে এই নীতিটি কাজে লাগে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে বসার পর বাইডেন প্রশাসনকে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়। গত বছর জুনে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ সম্মেলনের কথা ছিল। তবে এই সম্মেলন যে এখন নিকট ভবিষ্যতে হচ্ছে না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন গোয়েন্দারা ইউক্রেনের সীমান্তে রুশ সৈন্য উপস্থিতি শনাক্ত করে। বিষয়টি তারা ইউরোপীয় মিত্রদেরও অবহিত করে। স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইউক্রেনে যে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাইডেন প্রশাসন কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ক্রেমলিনের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু মস্কো এতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধই শুরু করে বসে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাইডেন ইউক্রেনকে সহযোগিতা ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ করেন। ওয়াশিংটন কিয়েভ যুদ্ধাস্ত্র, সরঞ্জামাদি ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে। অতিসম্প্রতি ইউক্রেনকে ট্যাংক পাঠানো নিয়ে অবশ্য কিছুটা সমস্যায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় পশ্চিমাদের সামরিক সরঞ্জামাদি ইউক্রেন যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে বলে মনে হয় না। এছাড়া রাশিয়ার কাছে হারানো এলাকাগুলো ইউক্রেন পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না, সেটা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যাই হোক, রুশ-মার্কিন প্রসঙ্গে আসি। এই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সম্পর্ক প্রেসিডেন্সির অবশিষ্ট মেয়াদে বাইডেন স্বাভাবিক করতে পারবেন বলেও মনে হয় না। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশল কী হতে পারে সেটা চলতি বছরই ঠিক করতে হবে। একটু পেছনের দিকে লক্ষ্য করা যাক। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিলেন। ট্রাম্পের সময় দেখা গেল, এই সম্পর্ক অনেক ওপরে উঠে গেছে। সেক্ষেত্রে উভয় দেশের সম্পর্কের তুলনায় দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কই বড় হয়ে উঠেছিল। বাইডেনের সময় এসে বরং দুদেশের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। যুদ্ধ এই সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে।

ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে বেশ অবনতি ঘটে। চীনের ওপর দফায় দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। বাইডেন সব বিধিনিষেধ না তুললেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক করেছেন। চীনের প্রযুক্তি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বেড়েছে। এসব কিছুর পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে দূরত্ব বেড়েছে। বাইডেন প্রশাসন তাইওয়ানের সঙ্গে ৩.৮ বিলিয়ন অস্ত্র-সহায়তাসহ নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

 

ইত্তেফাক/ইআ