বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

জেলা হাসপাতালে আইসিইউ: জনবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও চালু হয়নি একটিও

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:১৯

সারা দেশে জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল প্রশিক্ষণ দিয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্ট। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে। তারপরও একটি জেলাও চালু হয়নি আইসিইউ। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তার উদাসীনতার কারণেই জেলা পর্যায়ে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসাসেবায় আইসিইউ যে একটি অতীব জরুরি বিভাগ, করোনা মহামারি সেটি আমাদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। করোনা মহামারির সময় আইসিইউয়ের অভাবে অনেক রোগী মারা যান। শুধু করোনা নয়, অন্যান্য রোগীরাও আইসিইউ না পেয়ে মারা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেক জেলা হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ চালু করার নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের উদ্যোগে সারা দেশের ৬৩ জেলায় ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীসহ ২ হাজার ৫০০ জনের আইসিইউ ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাতে সংকটাপন্ন রোগীদের স্থিতিশীল অবস্থায় ঢাকায় রেফার করা যায়। প্রশিক্ষণের টাকা দিয়েছে সেভ দ্য চিলডেন ও ইউএস এইড। গত ডিসেম্বরে প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও চালু হয়নি আইসিইউ। একটি সিদ্ধান্তের জন্য আটকে আছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংকটাপন্ন রোগীরা। বাড়ছে সংকটাপন্ন রোগীদের মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, জনবল প্রস্তুত, যন্ত্রপাতিও আছে। তবে অবকাঠামো ঠিক হয়নি। গণপূর্ত করতে পারেনি। তাদের জন্য এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে দায়িত্ব  ছিল তা সঠিকভাবে পালন করেছে। কিন্তু গণপূর্তের অবকাঠামো নির্মাণের যে দায়িত্ব ছিল সেটা তারা করেনি। বেশির ভাগ দায়িত্ব ছিল গণপূর্তের। আইসিইউ চালু না হওয়ার এটা অন্যতম কারণ বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, অবকাঠামোর বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়নি। এটার সিংহভাগ দায়িত্ব গণপূর্তের। আমরা এই কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য কার্যক্রম নিয়েছি। গ্রাম অঞ্চলের রোগীদের জীবন রক্ষার্থে জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ দ্রুত চালু করবেন বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় চিকিৎসকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বাস্থ্য সেবা একটি ইমার্জেন্সি সার্ভিস। এটা হয়তো মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তারা মনে করেন না। জেলার সংকটাপন্ন রোগীরা আইসিইউ না পেয়ে ঢাকায় আসতে আসতে রাস্তায় কিংবা অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যাচ্ছে। ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহতদেরও আইসিইউয়ের প্রয়োজন হয়। এছাড়া অন্যান্য রোগীদেরও জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। নির্দেশের পর নির্দেশ দিলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? জরুরি সেবার বিষয়টি জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন—এটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বোঝা উচিত। তাদের জরুরি সার্ভিস সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। বিষয়টি মানবিক কারণে জরুরি ভাবার পরামর্শ দিয়ে চিকিৎসকরা বলেন, শুধু সময়মতো আইসিইউ না পেয়ে চোখের সামনে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এ সময় এক জন চিকিৎসক হিসেবে নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। চিকিৎসক হিসেবে এটা মা-বাবা-সন্তানসহ আপন জন হারানোর মতো বেদনাদায়ক। 

বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, আইসিইউয়ের ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন কে কোন জেলায় দায়িত্ব পালন করবেন, কতজন দায়িত্ব পালন করবেন, সেটা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর ঠিক করবেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়া হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন। তিনি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শকে মারা যান। ঐ সময় ঢাকায় আনার পর আইসিইউতে তার চিকিৎসায় নিয়োজিত একাধিক চিকিৎসক গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, ঐ জেলা হাসপাতালে যদি আইসিইউ ব্যবস্থা থাকত, সেখানে আইসিইউ সাপোর্ট দিয়ে স্থিতিশীল করে ঢাকায় পাঠালে তার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। সময়মতো আইসিইউ না পেয়ে কিবরিয়ার মতো অনেকে মারা যাচ্ছেন। 

জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রোগীর আইসিইউর প্রয়োজন হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউয়ের সাপোর্ট পাচ্ছেন না। তাকে পাঠিয়ে দিতে হয় রাজধানীতে। যানজটসহ দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসতে আসতে স্বজনদের সামনে তার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটে। আইসিইউ প্রয়োজন রোগীকে আইসিইউ ব্যবস্থাপনায় সেবা দিতে হয়। এর কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হাসপাতালে আগত রোগীদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ ভাগের আইসিইউর প্রয়োজন হয়। এ কারণে ১০০ বেডের হাসপাতালের জন্য ৫ থেকে ১০ বেডের আইসিইউ থাকা অত্যাবশ্যকীয়। আর ৫০ বেডের হাসপাতাল হলে তিন থেকে পাঁচ শয্যার আইসিইউ থাকতেই হবে। অর্থাৎ হাপসাতালে আইসিইউ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ নেই। কিছু সংখ্যক নামিদামি বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালেও আইসিইউ নেই। আবার কিছু হাসপাতালে থাকলেও কাজ করে না। রোগীকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে অনেক বেসরকারি হাপসাতাল। কয়েক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা আইসিইউ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। এটা দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা। চিকিৎসকরা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে এই সংকটাপন্ন রোগীরা তার মা-বাবা-ভাই-বোনসহ আপনজনের মতো। তাই জরুরি চিকিৎসাসেবার নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেটা ভেবেই করা উচিত বলে চিকিৎসকরা অভিমত ব্যক্ত করেন।

 

ইত্তেফাক/ইআ