পূর্বাভাস নেই, প্রস্তুতির সুযোগ আছে

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:১৫

তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাবিধুর। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত মানুষের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। বলা যায়, দুটি দেশ এখন চরম মানবিক বিপর্যয়ে। ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ায় শত শত ভবন ধ্বংস হয়েছে। এসব ভবনের নিচে আটকা পড়ে আছে অসংখ্য মানুষ। গত সোমবার তুরস্কের স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পনসহ শতাধিক আফটারশক আঘাত হেনেছে ঐ অঞ্চলে।

তুরস্ক ও সিরিয়া ভয়াবহ এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে—এমনটিই প্রত্যাশিত। সতর্কতার বিষয় এই যে, বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে—এটি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েই বলছেন। এজন্য আমাদের করণীয় এবং প্রস্তুতির কথাও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু আমরা তো ঘাড়ে এসে না পড়লে সেদিকে নজর দিই না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের উদাসীনতার বিষয়টি স্পষ্ট। কিন্তু ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস জানার সুযোগ কম। ফলে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে সম্ভাব্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখাই হচ্ছে উত্তম।

প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করছে, কিন্তু আমরা সাবধান হচ্ছি না। ফলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আমাদের ঘিরে রাখছে। আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশ রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। বিল্ডিং কোড মেনে না চলা, বন উজাড়, পাহাড় কেটে ধ্বংস করাসহ নানা উপায়ে আমরা যেন ভূমিকম্প নামক মহাবিপদ ডেকে আনছি।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা কয়েক লাখ। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী  দেশগুলোতে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পনেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন। এক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণে সরকারি তদারকি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। রাজধানীতে দিনদিন বাড়ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা। অল্প জায়গায় এত বড় বড় স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হচ্ছে ভবন। এতে স্বল্পমাত্রার কম্পনেই ভেঙে পড়তে পারে অনেক ভবন। এছাড়া ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায়ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। জনসচেতনতার জন্য চালাতে হবে ব্যাপক প্রচারণা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প রোধ করা সম্ভব নয়, তবে আমরা নিজেরাই যেন ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি না বাড়াই, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার বিকল্প নেই।

ভেতরে ও বাইরে থেকে ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশ ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এসব ভূমিকম্পের মধ্যে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পও রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব ভূমিকম্পে বড় মাত্রার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। না হলেও দেশের চারদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্প বলয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত হয়ে আছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় সময়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে। এর আঘাত সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর।

অতীতের মতো সাম্প্রতিক কালেও এসব এলাকা থেকে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার নজির রয়েছে। বিশেষ করে সিকিম, উত্তর-পূর্বে আসাম ও এর আশপাশের এলাকা থেকে এখন প্রায়ই ভূমিকম্প সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে ভূ-অভ্যন্তরে অধিক শক্তি জমা হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তের ভূমিকম্পের মাধ্যমে তা বের হয়ে আসবে। ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস আগে থেকে জানা যায় না। এছাড়া একে আটকানোর কোনো পথ নেই। এ অবস্থায় সচেতনতা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিশেষ করে সময় থাকতেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। লালনের গানের শরণ নিয়ে বলতে হয়, ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভূমিকম্পকে মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতিতে আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়। আর এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বাড়ানো। জাতীয় উদ্যোগ নিতে হবে ভূমিকম্পের সময় এবং তারপর কী করণীয়, সে সম্পর্কে মানুষকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান। সরকারি উদ্যোগে ফায়ার সার্ভিস, ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে। ভূমিকম্পের সময় দালান ভেঙে পড়ে বেশি মানুষের ক্ষতি হয়। তাই নির্মাণাধীন বাড়িগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হচ্ছে কি না, কর্তৃপক্ষকে সে ব্যাপারে তদারকি জোরদার করতে হবে।

উপকূলীয় এলাকা, যেখানে সুনামি, ভূমিকম্পসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে, সেখানে তৈরি করতে হবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র, যাতে মানুষ বিপদের সংকেত পাওয়ামাত্রই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, ভূমিকম্প হলে উত্তেজিত না হয়ে সাবধানে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি হবে। মানুষের জানমাল রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন