­এখন বড় বোনই আমার মা

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:১৫

সাফের ট্রফি রাতে নাকি শামসুন্নাহার জুনিয়রের বিছানায় ছিল। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসি তার বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন ট্রফি নিয়ে। সেটাকে অনুকরণ করেননি বাংলার ফুটবল যোদ্ধা শামসুন্নাহার। তবে সব ট্রফি যে তার বিছানায় ছিল সেটি খুব সহজেই বলে দিলেন। মেসির মতো কি না, সেটা বললেন না।

বৃহস্পতিবার রাতে কমলাপুর স্টেডিয়ামে চার দেশের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ৩-০ গোলে নেপালকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। অধিনায়ক শামসুন্নাহার একটা হ্যাটট্রিক করেছেন। ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন। টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন, ময়মনসিংহে কলসিন্ধুর কলেজে পড়া দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

দুই দুটি পুরস্কারের সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ট্রফি, এক হাতে নেওয়ার শক্তি নেই অধিনায়কের। ছিপছিপে শরীর। উচ্চতায় খুব বেশি না। আর ওজন ৪০ কেজি। হালকা-পাতলা শরীরের মানুষ শামসুন্নাহার। হাতের শিরা উপশিরাগুলো পরিষ্কার ফুটে উঠছিল। দুই হাতে তিনটা ট্রফি নেওয়া কঠিন। তাকে সহযোগিতা করছিলেন শাহেদা আক্তার রিপা। বাফুফের সামনে সবুজ লনে ট্রফি এনে ছবি তুলতে সহযোগিতা করলেন জুনিয়র ফুটবলাররা।

দিনভর সাংবাদিকদের আবদার মেটালেন ফুটবলাররা। যে যেভাবে কথা বলতে চাইলেন তাকে সেভাবেই কথা বলতে দেওয়া হলো। পড়ন্ত বিকালে বাফুফে ভবনের ছাদের ওপরে সানজিদা আক্তার চুলে রজনীগন্ধা ফুলের মালা খোঁপায় বেঁধে, শাড়ি পরে অন্যদের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত। এক ঝলক উঁকি দিলেন নিচে। দেখলেন সাংবাদকিরা শামসুন্নাহার জুনিয়র, রিপা, রূপনা চাকমাদের নিয়ে কথা বলায় ব্যস্ত।

শারীরিকভাবে ক্লান্ত শামসুন্নাহার। বলছিলেন তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। একদিন পর পর খেলা। সাত দিনে চারটি ম্যাচ। ঝড় গেছে খেলোয়াড়দের ওপর দিয়ে। তবুও কিছু করার নেই। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দে সব ভুলে যান। কিন্তু ভুলতে পারেন না মায়ের মুখ। ২০১৪ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন মা মারা যান, আমার ৯ বছর বয়স। আমার মা আবেদা খাতুন, বাবা নেকবর আলী, বড় বোন কামরুন্নাহার, আছে ছোট বোন। মা মারা যান অসুস্থ হয়ে। জানতে চাইলে শামসুন্নাহার বলেন, ‘পেটে ব্যথা হইত। টেস্ট করানো হইল। রিপোর্ট আসার আগেই মরে যায় মা। যার মরণ যেভাবে হয়। বাবা বিয়ে করেছেন। ওখানে দুই সন্তান রয়েছেন।’

শামসুন্নাহার অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে অধিনায়ক ছিলেন, অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে অধিনায়ক ছিলেন এবার অনূর্ধ্ব-২০ সাফে অধিনায়ক ছিলেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরে নেপালে সিনিয়র সাফের ফাইনালে খেলেছেন শামসুন্নাহার। বদলি নেমে গোলও করেছিলেন তিনি। জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি ছিল সেটি। আর এবার সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হলেও নেপালের টুর্নামেন্ট তার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয়। এত সাফল্যের মাঝে মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ে তার। মা নেই, কাকে বললেবন সুখ-দুঃখের কথা। একমাত্র বড় বোন কামরুন্নাহারের সঙ্গেই সবকিছু শেয়ার করেন নারী ফুটবলে বাংলাদেশের আক্রমণের বড় অস্ত্র শামসুন্নাহার।

কিছু বুঝে উঠার আগেই মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। শামসুন্নাহারের ফুটবল শক্তি ছিলেন তার মা। মাঠে যাওয়ার প্রেরণা ছিলেন তার মা। স্কুল ছুটির পর মাঠে ফুটবল খেলতেন। বাবা ফুটবলে দিতে চাননি। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় কলসিন্ধুর গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলসিন্ধুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়। 

শামসুন্নাহার বললেন, ‘আমরা ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ চ্যাম্পিয়ন হই। হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার মা আমাকে খেলায় উৎসাহ দিতেন। পৃথিবী থেকে মা চলে যাওয়ায় আমি বোনের কাছে বড় হয়েছি। মা বেঁচে থাকলে এসব সাফল্যের কথা মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতে পারতাম। এখন বোনের সঙ্গে বলি। বোনের বিয়ে হলেও সে আমার খোঁজ-খবর রাখে। সব কথা তার সঙ্গেই বলা হয়। এখন বড় বোনই আমার মা।’

ইত্তেফাক/এসএস