বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কুবিতে গবেষণা ও শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই: উপাচার্য

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২:০২

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩ জন উপাচার্য যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও পঠন পাঠনে যুক্ত ছিলেন তারা বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত আছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ম উপাচার্য হিসেবে গত বছরের ৩১ জানুয়ারি যোগদান করেন অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন। যোগদানের এক বছর পূর্তি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢেলে সাজাতে গবেষণা ও পাঠদানের পরিবেশ নির্মাণ, স্থানীয় জনসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত, মেধার বিকাশ ঘটানো ও মেধাবী তৈরিতে বিশেষ নজর দেওয়া, বিভিন্ন অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে অবকাঠামোগত, গবেষণাধর্মী ও দীর্ঘস্থায়ী টেকসই কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে কথা বলেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইত্তেফাক সংবাদদাতা জান্নাতুল ফেরদৌস

ইত্তেফাক: নতুন বছরের শুভেচ্ছা স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার যোগদানের এক বছর পূর্তি হয়েছে। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন দেখছেন?
উপাচার্য: নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এক বছর আগে আমাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তখন আমি গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান উঁচুতে নিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। দীর্ঘদিন বিদেশে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকে  আমি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তিনটি মৌলিক দিক রয়েছে, যথা- উচ্চ মান-সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষণ, গবেষণা এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এর উন্নতির লক্ষ্যে বিশেষ জোর দিয়ে একটি ভিশন তৈরি করি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা প্রধান স্টেকহোল্ডার, যেমন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, কুমিল্লার সিভিল সোসাইটি, প্রশাসন সকলকে এই ভিশন এর গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিতকরনের মাধ্যমে তাদের সমর্থন ও পার্টনারশীপ বৃদ্ধির চেষ্টা করি। তাছাড়া আমি দুর্নীতি, টেন্ডার ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করি যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতার সাথে সকলে গুণগতমান নিশ্চিত করে তাদের কার্যক্রম সম্পাদন করেন। যদিও মাত্র এক বছর পার হলো, কিন্তু এরই মধ্যে আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছি যা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। এই  বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ অত্যন্ত প্রশংসনীয় অবস্থায় রয়েছে। 

ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরিকল্পনা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশনকে সামনে রেখে। আমাদের ভিশন হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে লিডিং ইউনিভার্সিটির তালিকায় পৌঁছাতে উচ্চ মানের শিক্ষা, শিক্ষণ ও গবেষণার জন্য কাজ করা। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য ভালো শিক্ষক তৈরি করা, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক আপডেটেড কারিকুলাম তৈরী করা, উন্নত মানের শিক্ষা, শিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োগ যা ডিপ-লার্নিং ও অথেন্টিক লার্নিং এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, শান্তিপ্রিয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা, শিক্ষার ভালো সংস্কৃতি তৈরি করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণা ও উন্নত মানের আন্তর্জাতিক জার্নাল এ প্রকাশনার উপর গুরুত্ব দেওয়া এবং গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়া। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের বিনিময় নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এর আয়োজন করা যাতে করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞ শিক্ষক-গবেষকদের সাথে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং কোলাবোরেটিভ গবেষণা করা যায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এর সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভালো গবেষক তৈরি করার জন্য, ভালো শিক্ষার্থীদের মোটিভেট করার জন্য অ্যাওয়ার্ড ও স্কলারশিপ দিচ্ছি যেটা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এতোদিন হয়নি। আমি এসে শুরুতে ৫৮ জন শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দিয়েছিলাম এবার সেটা চারগুণ বাড়িয়ে ২৩৭ জনকে দিয়েছি। এজন্য সরকারি তহবিল এর পাশাপাশি  একটা নিজস্ব তহবিল গঠন করেছি। আমরা মনে করি এটা শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে উঠে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে। লাইব্রেরিকে সমৃদ্ধ করতে, একে আকর্ষণীয় স্থান বানানোর জন্য কাজ চলছে, ই-বুকের প্রকিউরমেন্ট এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সাথে কোলাবরেশন করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রান্টস কমিশনের সাথে সম্পাদিত এপিএর বিভিন্ন কম্পোনেন্ট এর বাস্তবায়নের প্রতি আমরা জোর দিচ্ছি এবং ইতোমধ্যে এই বছর আমরা পূর্বের বছরের  চেয়ে ১৯ ধাপ এগিয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন বিভিন্ন ধরণের সহশিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকে যেমন, বিতর্ক, সায়েন্স ফেয়ার, কালচারাল ইভেন্ট, আইটি সোসাইটি তার প্রতি নজর দেওয়া। আমি খুব আনন্দিত যে এই বিশ্ববিদ্যালযের শিক্ষার্থীরা এই ধরণের সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে  অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত থাকে।  বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রোগ্রামিং কনটেস্টে এবার আমরা ৯ পয়েন্ট এগিয়ে ১৭ তে এসেছি। এটিকে আমরা আরও উন্নত অবস্থায় নিতে চাই। শিক্ষক ও ছাত্রদের সক্ষমতা বাড়াতে টেকনোলজি বেইজড রিসোর্সগুলো বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।
আমি যোগদানের পর কিছু মিডিয়া প্রচার করেছিল আমাদের সার্টিফিকেট যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত করেছে। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে প্রমাণ করেছি সংবাদটি মিথ্যা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়কে দূষণমুক্ত রাখতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিন স্থাপন করেছি। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে এবং শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন ট্রেনিং এর আয়োজন করছি। 

ইত্তেফাক: আমাদের উচ্চশিক্ষার সংকটের জায়গাগুলো কোথায়?
উপাচার্য: প্রথমত, আমাদের দেশের পড়ানোর বিষয়টি আধুনিক ধারণা নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিকশিত হয়নি। কলেজের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের যে একটা বিশাল পার্থক্য আছে সেটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনুপস্থিত। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক হওয়ার জন্য শুরুতেই শিক্ষককে গবেষণায় ডিগ্রি (পিএইচডি) থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ভালো জার্নালগুলোতে রিসার্চ আর্টিকেল থাকতে হয়। বাংলাদেশে প্রফেসর হয়েও আমাকে অস্ট্রেলিয়াতে কাজ শুরু করতে হয়েছে লেকচারার হিসেবে। ইতোপূর্বে আমার প্রকাশিত আর্টিকেলগুলো কাউন্টেড হয়নি কেননা কোনো র‍্যাঙ্কড  জার্নাল ছাড়া ওরা আর্টিকেল কাউন্ট করে না। এ ধরণের বিষয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষকদের কোনো টিচিং কোয়ালিফিকেশন থাকে না। উন্নত দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়াতে শিক্ষকদের অবেক্ষাধীন সময়ে একটি টিচিং কোয়ালিফিকেশন করতে হয়, যেখানে শিখানো হয় লার্নিং পেডাগোজি, শিখানো হয় কিভাবে স্টুডেন্টদের এনগেজ করতে হয়, কিভাবে এসেসমেন্ট ডিজাইন করতে হয়, কিভাবে লার্নিং আউটকাম প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, কিভাবে ফিডব্যাক দিতে হয়, কিভাবে শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় টেকনোলজির ব্যবহার করতে হয়, এ বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভবে তাদের শিখে আসতে হয়। এই দিকে আমরা পিছিয়ে আছি। যদিও ইউজিসি আউটকাম-বেসড লার্নিং এর প্রতি জোর দিচ্ছে কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তা করতে পারছে না। শিক্ষকদের টিচিং কোয়ালিফিকেশন থাকলে এটা সহজ হত।    

দ্বিতীয়ত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যত সহজে পদোন্নতি হয়ে যায় দেশের বাইরে প্রক্রিয়াটি তত সহজ নয়। আমাদের দেশে শুধু টিচিং অভিজ্ঞতা কে ধরে প্রমোশন দেওয়া হয়, গবেষণা ও উন্নত মানের জার্নাল এ প্রকাশনা এবং স্টুডেন্ট এভালুয়েশন প্রায়ই কোনো গুরুত্ব পায়না। কিন্তু দেশের বাইরে শিক্ষা, শিক্ষণ, গবেষণা ও নিজের ডিসিপ্লিনে নেতৃত্ব এই সব বিষয় বিবেচনা করে প্রমোশন দেওয়া হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার পদ্ধতি সারফেইস লার্নিং কিন্তু আমরা দেশের বাইরে দেখতে পাই সেখানে ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতে পড়ানো হয় । আমরা যেমন বলি একজন ম্যানেজার এর গুণাবলি কেমন হবে তুমি লেখ। কিন্তু ওরা বলে একজন ম্যানেজার হিসেবে যাও, কাজ করো, প্ল্যান বানাও। তাঁরা শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তৈরির চেষ্টা করে । ডিপ লার্নিং এ  জ্ঞানের গভীরতা থাকে এবং তা হয় শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও প্র্যাকটিস-বেসড । তাদের পদ্ধতি হলো ‘লার্নিং ইট বাই ডুয়িং ইট’ । জ্ঞানের গভীরতায় পৌঁছাতে হলে শেখার দায়িত্বটা নিজেকেই নিতে হয়। এটা সাময়িক সময়ের জন্য নয় বরং তা হলো সারাজীবন-মুখী শেখা বা লাইফ লং লার্নিং।

চতুর্থত, টিচিংটা হবে স্টুডেন্টকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদেরকে শেখানো নয় বরং তাদের কাছ থেকেও শিখতে হবে।  এ ধরণের পরিবেশ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো অনুপস্থিত। পশ্চিমারা গবেষণা করা লোকদেরকেই শিক্ষক বানাচ্ছেন। যারা ইতোমধ্যে উপরোক্ত গুণাবলী সম্পন্ন সেখানে তাদের অতীতের একাডেমিক রেজাল্টও মুখ্য থাকে না। বরং বর্তমান অর্জনকেই মুখ্য বিবেচনা করা হয়। সে কারণে তাদের আউটপুটও টেকসই হয়।

ইত্তেফাক: শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের একাডেমিয়া ও গবেষণামুখী করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: শিক্ষার মান উন্নয়নে আমরা কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করা, যারা গবেষণায় লিপ্ত থেকে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করবে, যা ডিসিপ্লিন এর তাত্ত্বিক জ্ঞানের উন্নতি ছাড়াও সমাজ, দেশ ও বৈশ্বিক সমস্যা দূর করা সহ নতুন কিছু সৃষ্টি করবে যা মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। শুধু সিজিপিএ দিয়ে মানুষের গবেষণা করার সামর্থ্য বিবেচনা করা যায়না। তাদের উন্নত মানের পাবলিকেশন করার ক্ষমতা ও প্রমাণ থাকতে হবে।  আমার সময়ে যত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, তা এই প্রক্রিয়ায় হয়েছে, মেধা ছাড়া তাদের অন্য কিছু বিবেচনা করা হয়নি। শিক্ষকদের আপগ্রেডেশন এর বেলায় হাই-কোয়ালিটি জার্নাল এ প্রকাশনাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি, এবং প্রেডিটোরি জার্নাল এ পাবলিকেশন থেকে সকলকে বিরত রাখছি। দ্বিতীয়ত, উন্নত মানের গবেষণা ও প্রকাশনার প্রতি জোর দেওয়া। আমরা ২০২২-২৩ শিক্ষা বর্ষে ইউজিসি কর্তৃক প্রাপ্ত গবেষণার বাজেট বাড়িয়েছি। এর বাইরেও প্রথম বারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফান্ড থেকে শিক্ষকদের গবেষণা প্রকাশনায় সহায়তা দেওয়া ও যে সকল শিক্ষক  উচ্চ মানের জার্নাল এ প্রকাশনা করছে তাদের উৎসাহিত করতে একটি প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড এর ব্যবস্থা করেছি।
মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরির জন্য প্রথম বারের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফান্ড থেকে মেধাবৃত্তি চালু করেছি। তাছাড়াও তাদের গবেষণা, এক্সট্রা- কারিকুলার কার্যাবলী, বিতর্ক, খেলাধুলার জন্য সাপোর্ট দিচ্ছি। মেয়ে শিক্ষার্থীদের খেলা-ধুলা ছাড়াও শুদ্ধাচারের জন্য বৃত্তি চালু করেছি। এই কার্যক্রম গুলো চলমান থাকবে এবং এগুলোর পরিসর প্রতি বছরে বৃদ্ধি পাবে। আমি প্রাকটিস-বেজড এবং অথেনটিক লার্নিং এর প্রতি জোর দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের জন্য এমন এসেসমেন্ট এর প্রতি জোর দিচ্ছি, যা তাদের কগনিটিভ স্কিল এর পাশাপাশি তাদের সহনশীলতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যার বাস্তব সমাধানের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি করবে।
শিক্ষা ও গবেষণার উন্নতির জন্য গৃহীত পদক্ষেপ এর ফলাফল এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে।  আমার যোগদানের সময় এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স এ আমাদের মাত্র ৫ জন শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, এখন তা ১০ গুণ বেড়ে ৫৯ জন হয়েছেন। গ্লোবাল ওয়েবমেট্রিক্স র্যাঙ্কিং এ আমরা ৩১৬ ধাপ এগিয়েছি। আমাদের শিক্ষার্থীরাও  গবেষণার প্রতি ঝুঁকেছে। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ২০২২-২৩ এ আমাদের ৪১ জন শিক্ষার্থী মনোনীত হয়েছে, যা গতবছর ছিল ১৯।  আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে সেমিনার এ অংশ নিচ্ছে এবং গবেষণা পত্র উপস্থাপন করছে। সব কিছু মিলিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের  শিক্ষার্থীদের দ্বারা তৈরি ‘সিনা’ রোবট উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি হয়েছে, এটি আমাদের জন্য একটি বিরাট অর্জন।

ইত্তেফাক: ছাত্র সংগঠন এর সাথে উপাচার্যের দ্বন্দ্ব বেশ কয়েকবার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
উপাচার্য: ছাত্র সংগঠনের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মান সম্মত শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য কাজ করা, তাদের মধ্যে দেশ-প্রেম, সহমর্মিতা, নৈতিকতার মূল্যবোধের চর্চা করা। সেদিক থেকে আমার কার্যক্রমের সাথে সংগঠনের আদর্শের কোনো বৈরিতা নাই।  আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে দীর্ঘদিন ধরে সমাপ্ত না হওয়া শেখ হাসিনা হল দ্রুততার সাথে সমাপ্ত করি এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নিকৃষ্ট মানের আসবাবপত্রের টেন্ডার বাতিল করে উন্নতমানের আসবাবপত্র সংগ্রহ করি। শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, খেলাধুলা, কারিকুলাম আপডেট, মেধার ভিত্তিতে কর্মচারী ও শিক্ষক নিয়োগ, উন্নতমানের সরবরাহকারীর মাধ্যমে ই-জিপি প্রক্রিয়ার প্রায় শতভাগ প্রকিউরমেন্ট শুরু করি। এই সব কিছুই শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত উন্নয়ন বৃদ্ধি ও দুর্নীতি রোধের জন্য নেওয়া হয়েছে। সংগঠন এবং শিক্ষার্থীরা এই পদক্ষেপগুলোর পক্ষে।      

ইত্তেফাক: বিগত বছরের শেষ দিকে শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক দিক ছিল সবচেয়ে চর্চিত বিষয়। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে এ বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই?
উপাচার্য: শিক্ষকদের রাজনীতি তাদের নিজস্ব ব্যাপার এবং সেখানে আমার প্রশাসন নিরপেক্ষ। শিক্ষকবৃন্দ রাজনীতি করবেন, তবে সবকিছুর উপরে ওনারা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুনগত মান উন্নয়নের জন্য সর্বদা নিয়োজিত থাকেন, শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে সচেষ্ট থাকেন এবং শিক্ষার্থীদের মান  উন্নয়নে নিজেদের আরও বেশি নিয়োজিত রাখেন আমি তাদের কাছে সেই আবেদন রাখব।

ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি কেমন?
উপাচার্য: মেগা প্রকল্পের কাজ ৪ বছর স্থবির ছিল, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করি। বর্তমানে ভৌত কাঠামোর কাজ দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইত্তেফাক: আপনার বেড়ে ওঠা ও জ্ঞান অন্বেষণের গল্পটা জানতে চাই।
উপাচার্য: আমার জন্ম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। বেড়ে ওঠা বরিশাল। বরিশালেই বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে। বাবা আবুল মুজাফফর চৌধুরী ও মা ফিরোজা বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে আমি ৫ম। পারিবারিক সংস্কৃতি, ফুফু-খালা ও নিজ পরিবারের মধ্যে পড়ালেখার সংস্কৃতি চলমান থাকায় নতুন করে আলাদা মোটিভেশনের প্রয়োজন হয়নি। বাল্য ও কৈশোরের পড়ালেখা করেছি বরিশাল জেলা স্কুলে। এসএসসি ১৯৭৯ সালে। এইচএসসি ১৯৮১ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্টে পড়াশুনা শুরু করেছি সেবছরই। ১৯৮৪ সালে স্নাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়েছে ১৯৮৬ সালে (সেশনজট)। ১৯৮৮ সালে শেষ হয়েছে স্নাতকোত্তর। প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়েছি উভয় ডিগ্রিতেই । ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। ১৯৯২ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে স্ট্রাটেজিক ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্টারলিং এ পিএইচডি করেছি। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে করেছি পোস্ট ডক্টরেট, যেটি কিনা অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রাংকড বিশ্ববিদ্যালয় । এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছি দীর্ঘ ২৩ বছর। লেকচারার ও সিনিয়র লেকচারার হিসেবে ১৪ বছর শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলাম ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ায়। শিক্ষকতা পেশার বাইরে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউ কে এইড, সিডা, সুইচ এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড করপোরেশন এর মতো বহুজাতিক দাতা সংগঠনগুলোর টেকনিক্যাল অ্যাডভাইসার, ম্যানেজার ও কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছি ৬ বছর।

ইত্তেফাক: আপনার ব্যক্তিগত গবেষণার বিষয়ে জানতে চাই।
উপাচার্য: যৌথ লেখায় গবেষণাধর্মী বই 'দ্যা গোল অব সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট: রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড গভর্নেন্স', স্প্রিঙ্গার থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ৩৯ টি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে।  শিক্ষকতা পেশায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ও তাদের শিক্ষায় অবদান রাখায় ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়া থেকে ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড এর জন্য মনোনীত হয়েছি। ২০১৬ সালে আমার নেতৃত্বে মেলবর্নে আয়োজিত হয়েছে ১৫তম আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি সম্মেলন এবং ৬ষ্ঠ অর্গানাইজেশনাল গভর্নেন্স কনফারেন্স।  যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সাউথ আফ্রিকা, ইন্ডিয়া, অস্ট্রিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশ থেকে স্বনামধন্য গবেষকরা এই কনফারেন্সে গবেষণাধর্মী পেপার উপস্থাপন করেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড অ্যাকাডেমি অব ম্যানেজমেন্ট (আনজাম) এবং সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি রিসার্চ নেটওয়ার্ক এর সদস্য হিসেবে কাজ করেছি।

ইত্তেফাক: ধন্যবাদ স্যার।
উপাচার্য: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ইত্তেফাক/এআই