কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর তলদেশ-পাড় কেটে বেআইনিভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বালু উত্তোলন ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী চক্র এ কাজ করছে বলে জানা গেছে। এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙনঝুঁকিতে পড়েছে নদী-তীরবর্তী দৌলতপুরের বৈরাগীরচর, ফিলিপনগর, ভুরকাপাড়া, হাটখোলাপাড়া ও ভেড়ামারার অন্তর্গত ফয়জুল্লাহপুর, হরিপুর গ্রাম ও রায়টা ঘাট। এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলেও এটি থামাতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা নেই বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা আরো বলেছেন, বালু উত্তোলন ও ড্রাম ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে অন্তত ছয়টি গ্রামে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বৈরাগীরচর, ফিলিপনগর, রামকৃষ্ণপুর, মাজদিয়াড়, মহিষকুণ্ডি, আবেদের ঘাট, হাটখোলাপাড়া এবং ভেড়ামারার ফয়জুল্লাহপুর, হরিপুর ও রায়টা ঘাটের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত প্রমত্তা পদ্মা। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় জানা যায়, পদ্মা-গড়াই নদী বিধৌত কুষ্টিয়া সদর উপজেলাসহ অন্যান্য পাঁচটি উপজেলার আওতাভুক্ত অন্তত ২১টি বালুমহাল ১৪২৯ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারা দেয়নি জেলা প্রশাসন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জেলা জুড়ে চলছে বেআইনিভাবে বালু উত্তোলন। কোনো ধরনের ইজারা ছাড়াই নদীর তলদেশ-পাড় নির্বিচারে কেটে বালু উত্তোলন করছে এ চক্র। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে চলে এই বালু উত্তোলন। চলতি বছর দৌলতপুরের বৈরাগীরচর মণ্ডলপাড়া গ্রাম-তীরবর্তী পদ্মায় এই চক্র মিনি ড্রেজার বসিয়ে পদ্মার তলদেশ কেটে নৌকা ভর্তি বালু নদী তীরে স্তূপ করছে।
এছাড়া নদীর পাড় কেটে পলি মাটি-বালু উত্তোলনও চলছে হরদম। এভাবে বালু তোলার কারণে প্রতি বছর ভাঙনে আবাদি জমিসহ বিলীন হচ্ছে বিস্তৃীর্ণ জনপদ। নদী ভাঙতে ভাঙতে ধেয়ে এসেছে প্রতিরক্ষা বাঁধের একেবারে কিনারে। নদী কেটে বালু উত্তোলন ও বালু ভর্তি ভারী ট্রাকের যাতায়াতে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লকে নির্মিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী প্রতিরক্ষা বাঁধও ভাঙন হুমকিতে পড়েছে। এই প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিলে দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ পদ্মার পানিতে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। অতি সম্প্রতি দৌলতপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বালু উত্তোলনকারী সাত ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করেন। পরে স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান মুচলেকা দিয়ে ধৃতদের ছাড়িয়ে নেন।
স্থানীয় মরিচা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম দাবি করেছেন এখন আর পদ্মা থেকে বালু তোলা হচ্ছে না। তবে ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার মালিথা জানান, পদ্মা থেকে বালু তোলার পর বালুর স্তূপ জমা করা হয়েছে নদী তীরে। এখান থেকে বড় ড্রাম ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে বালু পৌঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে। এদের প্রতিহত করার কেউ নেই বলেও তিনি জানান। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসকসহ ভূমি মন্ত্রণালয়ে পত্র মারফত অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্রের বালু উত্তোলন ঠেকানো যাচ্ছে না।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বার জানান, পদ্মার তলদেশে কেটে বালু উত্তোলনে সরকারি অনুমোদন নেই। বালু তোলা বন্ধে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। আইন অমান্য করে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. সাইদুল ইসলাম জানান, পদ্মা নদী থেকে বেআইনিভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ডিসি জানান। কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি (দৌলতপুর) আকাম সরওয়ার জাহান বাদশাহ জানান, পদ্মায় বেআইনি বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
