রাষ্ট্রপতির পদ লাভজনক কিনা এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে কূট তর্ক দেখা দিয়েছে। অথচ উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে ইস্যুটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মামলায় উচ্চ আদালত এই ইস্যুটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছে ।
রাষ্ট্রপতির পদ যে লাভজনক পদ নয় সে বিষয়ে সংবিধানেও স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ রয়েছে।
প্রচলিত আইন বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এও উল্লেখ রয়েছে দেশের কোন কোন পদ লাভজনক। রাষ্ট্রপতির পদ লাভজনক কিনা তা নিয়ে উল্লেখযোগ দুটি মামলা বিবরণ রয়েছে ঢাকা ল’ রিপোর্টে (ডিএলআরে)।
১৯৮১ সালে উপরাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা হয়। রিটে দাবি করা হয়, উপরাষ্ট্রপতির পদ একটি লাভজনক পদ। লাভজনক পদে থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা বৈধ নয়। ঐ মামলার পর তড়িঘড়ি করে ১৯৮১ সালের ১০ জুলাই সংবিধান সংশোধন করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী পদকে প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদ বলে গণ্য করা হবে না। সংবিধানে ঐ সংশোধনীর পর ঐ রিট মামলাটি অকার্যকর হয়ে যায়।
আরেকটি মামলা হয় প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালের শাসনামলে প্রধান বিচারপতি থেকে অবসরের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন রিট মামলায় দাবি করা হয়, বিচারপতির পদ থেকে অবসরের পর কোনো লাভজনক পদে যাওয়া যায় না। বিচারপতি মো. আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের বেঞ্চ রিট পিটিশন খারিজ করে রায় দেন রাষ্ট্রপতির পদ লাভজনক নয়। অন্য কোনো মামলায় এই রায় এখনো পালটায়নি। ফলে এই রায় একটি চূড়ান্ত রায় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছ।
দেশের কোন কোন পদ লাভজনক তা আমাদের প্রচলিত আইনেই উল্লেখ রয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এ। ঐ আইনে ১২ ধারায়। সেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ বা ৫০ শতাংশের বেশি সরকারি শেয়ারসংবলিত কোম্পানির চাকরি বা পদকে ‘লাভজনক পদ’ বলা হয়েছে। লাভজনক পদ হিসাবে সংজ্ঞায়িত আছে—প্রজাতন্ত্র ; বা সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ; বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি; এবং যে সকল কোম্পানিতে সরকারের ৫০% এর অধিক শেয়ারের মালিকানা আছে, সেই সকল কোম্পানিতে সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত অফিস, পদ বা অবস্থান।
সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনাদিযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী। প্রজাতন্ত্রের কর্ম মানে হলো: বাংলাদেশ সরকারের সামরিক বা বেসামরিক প্রকৃতির কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ, কিংবা আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম হিসেবে ঘোষিত হতে পারে এরূপ অন্য কোনো কর্ম। অন্যদিকে ২০০১ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ে বলা হয়, যে পদে নিয়োগ ও পদচ্যুতির ক্ষমতা সরকারের হাতে, সে পদ লাভজনক পদ। রাষ্ট্রপতির পদ সরকারি চাকরি নয়। সরকারি নির্দেশে রাষ্ট্রপতির পদও যায় না। রাষ্ট্রপতির পদ যে লাভজনক পদ নয়, এই বিষয়টি ও সংবিধানে সুলিখিতভাবে বলা হয়েছে। সংবিধানের ৬৬(৩) বলা আছে, কোন ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না। সংবিধানের এই বিধান থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো মহল দুদক আইনের একটি ধারা সামনে নিয়ে এসেছেন । দুদকে আইনে উল্লেখ আছে কমিশনারগণ মেয়াদ শেষে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিয়োগ পেতে পারেন না । দুদক আইন দেশের সর্বোচ্চ আইন নয়। দেশের সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান ।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের প্রাধান্য ৭ (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমাঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।

