চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে বকেয়া বিলের পরিমাণ বাড়ছে। নিয়মিত বিল আদায় হচ্ছে কম। কোম্পানিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া আদায়ে কোম্পানির কার্যকর উদ্যোগ নেই। নন-মিটার গ্রাহক পর্যায়ে আবাসিক খাতে প্রচুর বকেয়া রয়েছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা পর্যায়ে বকেয়া আরও বেশি। কর্তৃপক্ষ জানায়, বকেয়া পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের চিঠি দিয়ে ও ফোনে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ভিজিল্যান্স টিম অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, বেসরকারিতে বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। আর সরকারি পর্যায়ে বকেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনেক পুঞ্জীভূত বকেয়াও রয়েছে, যা বছরের পর বছর পড়ে থাকলেও আদায় হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে গৃহস্থালি খাতে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও মামলা না দেওয়ায় পুনরায় গ্যাস চুরিতে লিপ্ত হচ্ছেন লোকজন।
কর্মকর্তারা জানান, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে প্রতি মাসে ৩৬০ থেকে ৩৮০ কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি হয়ে থাকে। আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটার রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার আবাসিক গ্রাহক নন-মিটারে বিল পরিশোধ করেন। ২৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে গ্যাস বিল পরিশোধ করেন গ্রাহকরা। নন-মিটার আবাসিক গ্রাহকরা বিকাশ, রকেট, মাস্টার কার্ড, শিওর ক্যাশ-এর মাধ্যমে গ্যাস বিল পরিশোধ করতে পারেন।
জানতে চাইলে কেডিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাস বিল নিয়ে মন্ত্রণালয় ও কোম্পানির কর্মকর্তারা মনিটরিং করছেন। সরকারি পর্যায়ে গ্যাস বিল বকেয়া বেশি। আমরা বকেয়া আদায়ে নিয়মিত ভিজিল্যান্স টিমের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছি। কোম্পানির রাজস্ব বিভাগের ডিজিএম (উত্তর) মুজিবুর রহমান বলেন, গ্যাস বিল তিন মাস বকেয়া থাকলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নিয়ম রয়েছে। খেলাপি গ্রাহকদের বিল পরিশোধের জন্য আমরা টেলিফোন করে তাগাদা দিচ্ছি। এলাকায় মাইকিংও করা হয়। তার পরও বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি বিপণন (উত্তর) মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম খান বলেন, বকেয়া অনেক কমে এসেছে। আমরা বকেয়া আদায়ে কোনো আপস করছি না। আমাদের কোম্পানিতে প্রতি মাসে ৩০০ কোটি টাকার বিল হয়। বকেয়া তিন মাস অতিক্রম করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। সরকারি বকেয়া বেশি রয়েছে। বকেয়ার সঙ্গে আবার সারচার্জ যুক্ত হচ্ছে। ফলে হিসাবে বকেয়ার পরিমাণ বেশি মনে হচ্ছে।
চার মাসের গ্যাস বিল অনাদায়ী হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিধান রয়েছে। বকেয়ার তালিকায় দেখা গেছে গৃহস্থালি খাতে সরকারি পর্যায়ে ৩৫ কোটি টাকা ও বেসরকারি খাতে ৫৬ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখেও গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বকেয়া আদায় নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা বকেয়া পরিশোধের জন্য মাইকিং করেন। নোটিশ পাঠান। কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির ডিজিএম (রাজস্ব) প্রকাশ কুমার রায় বলেন, অনেক গ্রাহক অনলাইনে বিল পরিশোধ করেন। বকেয়া পরিশোধে এলাকায় এলাকায় মাইকিং ছাড়াও গ্রাহকদের কাছে বকেয়ার হিসাব পাঠানো হয়। তার পরও যদি পরিশোধ না করে সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের প্রক্রিয়া শুরু করি।
কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে সব মিলিয়ে ৬ লাখ ২ হাজার ৩৭৫টি গ্যাস সংযোগ রয়েছে। তার মধ্যে আবাসিক সংযোগ রয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার, শিল্প ১ হাজার ১৮১টি, ক্যাপটিভ পাওয়ার ২০১টি, বাণিজ্যিক ২ হাজার ৯১১টি ও সিএনজি ৭০টি। বাকিগুলো অন্যান্য খাতে সংযোগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ করা গেলে বর্তমানের দ্বিগুণ রাজস্ব আয় করা যেত। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থাৎ গত জুন মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ১৫৭ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তার বিপরীতে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৯৫ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস। অর্থাৎ গত অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গ্যাস বিক্রি হয়েছে সার কারখানায়। এই খাতে ২ হাজার ২৪ দশমিক ৭৭ কোটি টাকার গ্যাস বিক্রি করা হয়েছে। শিল্প খাতে (বৃহৎ) গ্যাস বিক্রি হয়েছে ৫৮০ কোটি ২৬ লাখ টাকার। ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ক্যাপটিভ পাওয়ার রয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার খাতে গ্যাস বিক্রি হয়েছে ৭৩২ কোটি ৩২ লাখ টাকার। আবাসিক খাতে গ্যাস বিক্রি হয়েছে ৬৭৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস বিক্রি হয়েছে ৪৭০ কোটি ৭৩ লাখ টাকার। গ্যাসসংকটের কারণে বছরের অধিকাংশ সময় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ ছিল। ফলে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বিক্রি হয়েছে ২৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
জানা গেছে, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে মোট সংযোগ রয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৭০৩টি। গ্যাস চুরি বন্ধ, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও বকেয়া আদায়ের অভিযান পরিচালনা করার জন্য কোম্পানির যে ভিজিল্যান্স বিভাগ রয়েছে সেটি শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে, মামলা করতে পারে না। ফলে বার বার অবৈধ গ্যাস সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে, দেদার চুরি হচ্ছে গ্যাস।
