শুক্রবার, ৩১ মার্চ ২০২৩, ১৭ চৈত্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শবে মিরাজ

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:৩৬

৬২১ খ্রিষ্টাব্দের রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে মিরাজ সংঘটিত হয়। পবিত্র হাদিস শরিফে মুসলমানদের জন্য বছরে যে পাঁচটি রাতকে বিশেষ ফজিলত ও তাত্পর্যপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তন্মধ্যে ‘শবে মিরাজ’ একটি। পবিত্র কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত। যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনকারী’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত-১)।

কোরআন শরিফে আরো বলা হয়েছে, রসুল (স.) সপ্তাকাশ অতিক্রম করে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’য় পৌঁছান এবং সেখান থেকে ‘রফরফে’ আরোহণ করে সর্বলোকের অতীত ‘কাবা কাওসায়ন আও আদনা’র মাকামে মহান আল্লাহর একান্ত নৈকট্যে যান এবং আল্লাহপাকের দিদারলাভে ধন্য হন। মিরাজের রাতে রসুল (স.) আল্লাহ তাআলার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল (সুরা আন নাজম, আয়াত-১১)।

মেশকাত শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মিরাজ’ রজনিতে রসুল (স.) উম্মে হানি বিনতে আবু তালিবের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাত্ হজরত জিবরাইল (আ.) এসে তাকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান, যেখানে তিনি তার বুক বিদীর্ণ করে জমজম কূপের পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার ও শক্তিশালী করেন। এ ঘটনাকে ‘শাক্কুস সদর’ (বক্ষ বিদীর্ণ) বলা হয়। তারপর সেখান থেকে তিনি ‘বোরাক’ নামক এক ঐশী বাহনে চড়ে বায়তুল মোকাদ্দাসে এসে সব নবির ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি বোরাকে চড়ে ঊর্ধ্বে গমন করতে থাকেন। একের পর এক আসমান অতিক্রম করেন। রাস্তায় হজরত মুসা (আ.)সহ বেশ কয়েকজন নবি-রসুলের সঙ্গে তার দেখা হয়। সপ্তম আসমানের পর তাকে বায়তুল মামুর দেখানো হয়। সেখানে তিনি স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম, কুরসি, লওহ-ক্বলম প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করেন। বায়তুল মামুরে হজরত জিবরাইল (আ.)কে রেখে তিনি ‘রফরফ’ নামক আরেকটি আসমানি বাহনে চড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধানসহ তিনি  ফিরে দেখলেন পৃথিবীর অতি সামান্য সময় অতিবাহিত হয়েছে। অজুতে ব্যবহূত পানি তিনি যেমন গড়াতে দেখে গিয়েছিলেন, ফিরে এসেও দেখলেন ঠিক তেমনি গড়াচ্ছে এবং ঘরের শিকলও আগের মতো নড়ছে।

মিরাজের লক্ষ্য ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রসুল (স.)কে ইহজগত্ ও পরজগতের মধ্যে ‘ইনসানে কামেল’ বা ‘পরিপূর্ণ মানব’-এর যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক শক্তি ও গুণাবলি প্রদান করা। এখানে ধর্মকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। দরকারও নেই। কারণ ধর্ম হচ্ছে মূলত বিশ্বাসের বিষয় আর বিজ্ঞান হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো কিছু আবিষ্কার করা। দেখা যায়, আজ বিজ্ঞান যা বলছে, কিছুদিন পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তা আবার বাতিল হচ্ছে। তাই মিরাজকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করতে হবে এমনটির দরকার নেই। যাদের বিশ্বাস দৃঢ় তারা রসুল (স.)-এর মিরাজ বিশ্বাস করেন এবং করবেন। এতত্সত্ত্বেও মিরাজ সংঘটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন—১. রসুল (স.)-এর দেহ মাটির তৈরি (আনা বাশারুম মিসলুুকুম। সুরা কাহাফ, আয়াত-১১০)। মাটির দেহ নিয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করে কোনো ব্যক্তির পক্ষে ঊর্ধ্বারোহন কি সম্ভব?  ২. ভূমণ্ডলের ওপরে অক্সিজেনবাহী বাতাসের অবস্থান মাত্র ৫২ মাইল ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বায়ুস্তরের ওপরে ঊর্ধ্বাকাশে রয়েছে হিলিয়াম, ক্রিপটন, জিয়ন, মহাজাগতিক রশ্মি ও উল্কাপাতের মতো ভয়ংকর ও প্রাণ হরণকারী বস্তুসমূহের অবস্থান। এ অবস্থায় রসুল (স.)-এর পক্ষে বায়ুস্তর ভেদ করে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ কীভাবে সম্ভব হলো? ৩. মুহূর্তের মধ্যে কী করে এত বড় একটি কাজ সম্পাদিত হতে পারল? কোন কোন রেওয়াতে এ রকম বর্ণনা পাওয়া যায় যে, মিরাজের পুরো কর্মকাণ্ড সমাপ্ত হতে পৃথিবীর সময়ের হিসাবে মোট ২৭ বছর সময় লেগেছিল, যা পার্থিব সময়ের হিসাবে ‘মহূর্ত’ বলে চিহ্নিত। ৪. রসুল (স.)-এর মিরাজ কি শারীরিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, নাকি আত্মিক বা আধ্যাত্মিকভাবে? (চলবে)

লেখক : উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ; প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন