বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের ভাষা কী আধিপত্যের শিকার?

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩:৫০

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র-নৃ‌গোষ্ঠী‌দের ভাষা বাংলা ভাষার আধিপত্যের শিকার কী না তাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মহান ভাষা আন্দোলন ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন। কিন্তু সেই চেতনার বিকাশ হচ্ছে না বলে অভিযোগ গবেষক ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের।

তারা মনে করেন, একই প্রক্রিয়ায় বাংলা নিজেও এখানে ইংরেজি আধিপত্যের শিকার।

বাংলাদেশে কমবেশি ৫১টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী আছে। তাদের ভাষা আছে ৪৫টি। তার মধ্যে ১৪টি ভাষা বিলুপ্তির পথে বলে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। এর মধ্যে মহাবিপন্ন হলো রেমিংটচা। এই ভাষায় মাত্র ছয় জন লোক এখন কথা বলেন। 

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের ভাষার গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, ‘এই ভাষায় যে ছয়জন কথা বলেন তাদের সর্ব কনিষ্ঠজনের বয়স ৫৬ বছর। এই ছয়জন মারা গেলে ভাষাটি হারিয়ে যাবে। এর কোনো লিখিত রূপ নাই। আবার যে ছয়জন আদিবাসী এই ভাষায় কথা বলেন তারা একই পরিবার বা একই এলাকায় থাকেন না।’

শুধুমাত্র রেমিংটচা ভাষা নয়। এর সঙ্গে মহা বিপদাপন্ন যে আরও ১৩টি ভাষা আছে। সেইসব ভাষায় কথা বলা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের সংখ্যাও কমছে। এই ১৪টি ভাষায় কোনোটিতে সর্বোচ্চ দুই হাজার ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী কথা বলেন। কিন্তু কোনোটিরই বর্ণমালা বা লিখিত রূপ নাই।

মাত্র পাঁচটি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ভাষায় টেক্সটবুক আছে। তাও আবার প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। সরকারি উদ্যোগে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি এই পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। 

মথুরা ত্রিপুরা বলেন, ‘ফলে এটা আসলে পরবর্তী শিক্ষায় আর কাজে লাগে না। আমাকে তাই বাংলা ইরেজিসহ ছয়টি ভাষা শিখতে হয়েছে।’

বাংলাদেশে এখন সর্বোচ্চ ২০টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ভাষার বর্ণমালা ও লিখিত রূপ আছে। বাকিগুলো ওইসব জনগোষ্ঠীর মুখে আছে। ফলে সেগুলোও বর্ণমালা ছাড়া টিকবে না, হারিয়ে যাবে।

মথুরা ত্রিপুরা বলেন, ‘এখানে সরকারের দায়িত্ব আছে। কিছু কাজ সরকারের উদ্যোগে হলেও তা সামান্যই। কিন্তু যাদের ভাষা তাদেরও দায়িত্ব আছে। ভাষার চর্চা, ওই ভাষায় লেখালেখি বা সাহিত্য চর্চা না করলে তো ভাষা টিকবে না।’

তার মতে, ‘যে ভাষায় যত কম লোক কথা বলেন সেই ভাষা তত বিপন্ন। সার্বিকভাবে এই ভাষাগুলো বাংলার আধিপত্যের শিকার। আবার ওই ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে যাদের ভাষায় বেশি লোক কথা বলেন তাদের আধিপত্যের শিকার অন্য ক্ষুদ্র ভাষা গোষ্ঠী। এর অর্থনৈতিক দিকও আছে। চাকরি পেতে ব্যবসা করতে যে ভাষার গুরুত্ব বেশি সেই ভাষা অন্য ভাষাকে দুর্বল করে দেয়।’

বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য এবং ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী কবি ও গবেষক সিং ইয়ং ম্রো বলেন, ‘কিছু ভাষা আছে যেগুলো আসলে টিকিয়ে রাখার আর কোনো সুযোগ নাই। ওই ভাষার বর্ণমালাও নাই আবার লোকও খুবই কম। ফলে তারা হারিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার। কিছু ভাষা আছে যে ভাষায় কথা বলার লোক মোটামুটি আছে। কিন্তু এর বর্ণমালা তৈরি করতে গিয়ে সংকট হচ্ছে। কারণ তারা একমত হতে পরছেন না। যেমন খুমি ভাষা। এ ধরনের ভাষাও হারিয়ে যাবে।’

তার কথা, ‘চর্চা রাখতে হবে। ওই ভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ না থাকলেও সাহিত্য, গল্প, কবিতাসহ আরও চর্চার ক্ষেত্র আছে। সেটা করতে হবে। তা না হলে ভাষা টিকবে না। যেমন আমরা ম্রো ভাষায় সাহিত্য চর্চা করছি। নিজেরাই পড়ালেখার বই ছাপিয়েছি। কম্পিউটারে ফন্ট তৈরি করেছি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন নিজের ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।  তবে সরকারের উদ্যোগও আরও প্রয়োজন। যেমন আমরা বান্দরবান জেলা পরিষদের নিয়ম করেছি এখানে কোনো চাকরির আবেদন করলে নিজের মাতৃভাষার জন্য ১০ নাম্বার রেখেছি’ জানান সিং ইয়ং ম্রো।

তিনি বলেন, ‘বাংলা, ইংরেজি না জানলে চাকরি পাওয়া যায়না। ফলে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ভাষার গুরুত্ব অনেক কম। সেই বিবেচনায় বাংলাও এখন ইরেজির কাছে অবহেলার শিকার।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সুমন সজ্জাদ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন অনেক দিন ধরে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের ভাষা বাংলা ভাষার আধিপত্যের শিকার হয়েছে। আর তাদের ভাষার চর্চা কমেছে এবং বর্ণমালা সময়ের সঙ্গে আপডেট করার যে বিষয় রয়েছে তা তারা করেনি। ভাষার ধাপগুলো যেভাবে পেরোতে হয় তারা তা করছে না। ফলে অনেক ভাষাই এখন বিপদাপন্ন এবং হারিয়ে যাওয়ার পথে।’

তার কথা, ‘বাংলা একাডেমি তো শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য কাজ করে। এখানেও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ভাষা ও সাহিত্যের কোনো জায়গা নেই।’

তিনি বলেন, ‘মহান ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ভাষার মর্যাদা নিয়ে কাজ করলে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের ভাষা অবহেলিত থাকার কথা নয়।’

তিনি মনে করেন, ‘প্রত্যেক ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যে আদের ভাষার চর্চা রাখা যেমন জরুরি। তেমনি সরকারকেও উদ্যোগী হতে হবে।’

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক রুনেল চাকমা বলেন, ‘আমরা তিনটি নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করি। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। এর বাইরে আমাদের কোনো কাজ নেই।’

আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. হাকিম আরিফ বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণসহ এর চর্চা ও বিকাশে একটি প্রকল্প নিয়েছি। এখন জনবল ও অবকাঠামোর কাজ চলছে। ওই ভাষাগুলোর সংকট নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে। আমরা অবশ্যই কাজ করব।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম