বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলা ও সংস্কৃত: দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্ক

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৯:৩৯

ভাষার ব্যাপারটিকে কেবলই যদি ভাষার ব্যাপার বলে মনে করি, আর ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বে নিয়মকানুনের মধ্যেই ভাষাবিষয়ক ভাবনাকে সীমিত রেখে দিই, তাহলে এর তল পাওয়া যাবে না কিছুতেই। এতে বরং ক্রমাগত নানা রকম ভ্রান্ত ধারণারই উদ্ভব হতে থাকবে। ঐ ভ্রান্ত ধারণাগুলোর হেতু ও প্রতিষেধক সন্ধান করতে হবে সামাজিক ইতিহাস ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীরে। অর্থাত্ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষার উত্সমুখ যে সমাজসংগঠন তাতেই ভাষাবিষয়ক সমস্যার স্বরূপ ও সমাধানের সূত্র অনুসন্ধেয়। আমাদের ভাষা সমস্যার নানা দিক—এমনকি বাংলা ও সংস্কৃতের সম্পর্ক নিয়ে নানা টানাপড়েনের বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে হলেও এ অঞ্চলের অধিবাসীদের আর্থসামাজিক অবস্থান এবং তাদের ভেতরকার বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাতগুলোকে অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে এখানকার দুইটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের তখন সামাজিক বিকাশের দিকে।

না, সাম্প্রদায়িক ধর্মভেদে ভাষাভেদ হয় না। যে কোনো ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ যে কোনো ভাষা বাঙালি হিন্দু মুসলমানসহ যে কোনো ধর্ম সম্প্রদায়েরই মাতৃভাষা। তাই ধর্মভেদের কারণে ভাষার অধিকার নিয়ে কিংবা সে ভাষার প্রয়োগ প্রকরণ নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদের কোনো কারণই তো থাকতে পারে না। তবু তত্ত্বগতভাবে এ রকম কারণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না গেলেও বাস্তবে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ধর্মস্বাতন্ত্র্য তাদের ভেতর একসময় ভাষা স্বাতন্ত্র্যবোধকেও উসকে দিয়েছে এবং সেই উসকানি থেকে যে খণ্ড প্রলয়ের মতো ঘটনা ঘটে গেছে, সে কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলা ভাষার আদি, আদি মধ্য ও অন্ত্যমধ্য যুগেও বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমানের দ্বন্দ্ব সমন্বয়ের ছাপ ও ভাষার ওপর যে নানাভাবে পড়েছে সে বিষয়ে আমরা আগেই জেনেছি। দেশজ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের হাতে লালিত শিশু বাংলা ভাষা বহিরাগত ব্রাহ্মণশক্তির দেবভাষার হাতে যেমন লাঞ্ছিত হয়েছে, তেমনি অন্ত্যমধ্য যুগেও এমন কিছু শক্তিধর ধর্মধ্বজী বঙ্গতে জন্মেও বঙ্গবাণীকে হিংসা করেছে এবং আরবি ফারসি হিন্দুস্তানি ভাষার দাপট দেখিয়ে তাকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে। এসবের পেছনেই ক্রিয়াশীল ছিল ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থরক্ষার রাজনীতি। আবার ক্ষমতাবঞ্চিত প্রাকৃতজনই ক্ষমতাধরদের সে রাজনীতি ব্যর্থ করেও দিয়েছে। বলা যায়, শ্রেণিসংগ্রামের সাধারণ নিয়মই ভাষার ক্ষেত্রেও কার্যকর হয়েছে। তাহলে ভাষারও কি শ্রেণিচরিত্র আছে? ভাষা মানেই কি বিশেষ বিশেষ শ্রেণির ভাষা?

এর উত্তরও অবশ্যই না। ধর্ম সম্প্রদায়ভেদে যেমন ভাষাভেদ হয় না, তেমনি হয় না শ্রেণিভেদেও। অর্থাত্ শ্রেণিভাষা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তবু তা না থাকলেও শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবাহিনীরূপে কমিউনিস্টরা যখন বিপ্লবের মাধ্যমে সচেতনভাবে একটি শ্রেণিরাষ্ট্র গড়ে তুলল, তখন তাদের একটি বড় অংশের ভেতর শ্রেণিভাষার চেতনাও দেখা দিল; শ্রেণিস্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাস্বাতন্ত্র্যের ভাবনাও তাদের মাথায় চেপে বসল। শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র তার নিজস্ব শ্রেণিভাষার চর্চা করবে—এ রকম ধারণা জনগণের মধ্যে চালিয়ে দেওয়া হলো। এমনকি সে সময়কার সোভিয়েত দেশের ভাষাবিজ্ঞানীদেরও কেউ কেউ শ্রেণিভাষার ভ্রান্তিবিলাসে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন।

এমনই একজন ভাষাবিজ্ঞানী হলেন এন ওয়াই মার। তিনি এবং তার অনুসারীবৃন্দ মিলে ভাষাবিজ্ঞানের এতাবত্কালের প্রায় সব অর্জনকেই বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীলের ছাপ মেরে বর্জন করতে চাইলেন। শিল্পকলা, সাহিত্য, আইন, দর্শন ইত্যাদির মতো ভাষাকেও তারা সমাজের উপরিকাঠামোর অন্তর্গত বলে বিবেচনা করলেন। উপরিকাঠামোর অন্তর্গত বলেই তাদের মতে, ধনতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে প্রচলিত ভাষা সমাজতন্ত্রে চলতে পারে না। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রুশ ভাষার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, সমাজতান্ত্রিক সমাজের নতুন নায়ক শ্রমিকশ্রেণির ভাষাই পূর্বতন সমাজের কর্তৃত্বশীল বুর্জোয়াশ্রেণির ভাষাকে বাতিল করে দেবে। এন ওয়াই মার ভাষাতত্ত্বের তুলনামূলক ঐতিহাসিক পদ্ধতিকেও ভাববাদী আখ্যা দিয়ে তার ওপর তীব্র আক্রমণ চালালেন। তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের বদলে মার এক অভিনব ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রবর্তন করতে চাইলেন। সে পদ্ধতির নাম চার উপাদানের বিশ্লেষণ। সে পদ্ধতির মূল কথা হলো মানবজাতির আদিমতম ভাষা চারটি শব্দাংশ SAL, BER, YON ও ROSH থেকে উত্পন্ন হয়েছে।

ভাষাবিজ্ঞানের কোনো উপাত্তের সাহায্যেই মারের এই অভিনব ভাষাতত্ত্বকে যুক্তিগ্রাহ্য করা যায় না যদিও, তবু নিতান্ত গায়ের জোরেই মার তার স্বকপোলকম্পিত তত্ত্বকে বিজ্ঞান বলে চালাতে চেয়েছিলেন এবং তার এই প্রয়াস বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত দেশে একদল অতি উত্সাহী কমিউনিস্টের মধ্যে একধরনের মৌতাতের সৃষ্টি করেছিল। শ্রেণিভাষার নামে তারা ভাষার ক্ষেত্রে কালাপাহাড়ি কাণ্ডকারখানার জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলেন। আসলে এন ওয়াই মার এবং তার শিষ্যরা মার্কসবাদের পতাকা আন্দোলন করে এবং মার্কসীয় পদ্ধতির নাম করেই ভাষা সম্পর্কে নিতান্ত অমার্কসীয় ও মার্কসবাদবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেছিলেন। মার্কস-অ্যাঙ্গেলস ভাষাকে দেখেছেন চিন্তার প্রত্যক্ষ বাস্তবতা হিসেবে। মার্কস স্পষ্ট বলেছেন যে, ভাব ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে না। অথচ কট্টর মার্কসবাদী বলে পরিচিত মার চিন্তাকে বিযুক্ত করলেন ভাষা থেকে। তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, মাত্র ততক্ষণ পর্যন্ত ভাষার অস্তিত্ব থাকে, আবার ভাষায় প্রকাশ না পেলেও চিন্তন প্রক্রিয়া চলে। অর্থাৎ মারের মতে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাব সংযোগ ভাষা ছাড়াই সম্পন্ন হতে পারে।

স্বস্তির বিষয় এই, সোভিয়েত দেশে ভাষাচিন্তার এমন ধারা নৈরাজ্য খুব বেশি দিন ধরে চলতে পারেনি। সে সময়কার সোভিয়েত দেশের কর্ণধার জোসেফ স্তালিন নিজে ওই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেন। এন ওয়াই মার ও তার বিষ্যদের অভিনব বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি দেখালেন যে চিন্তাকে ভাষা থেকে বিযুক্ত করে এবং তাকে ভাষার স্বাভাবিক বস্তু থেকে মুক্ত করে এন ওয়াই মার ভাববাদের জলাভূমিতে অবতরণ করেছেন। মার্কসবাদের নামে ভাববাদের জলাভূমিতে নেমেই যে মার ও তার শিষ্যরা শ্রেণিনির্বিশেষে ব্যবহূত ও প্রচলিত সমগ্র সমাজের ভাষার বদলে শ্রেণিভাষা নামক একটি অস্তিত্বহীন বিষয়ের সন্ধানে ও সৃজনে নিরত হয়েছিলেন স্তালিন তাও স্পষ্ট করে তুললেন। স্তালিনের এই ভূমিকাই উন্মার্গগামী ভাষা বিচারের হাত থেকে সোভিয়েত দেশকে সে সময় মুক্ত করেছিল।

লেখক: শিক্ষাবিদ

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন