গুজরাটের দাঙ্গায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা নিয়ে তৈরি বিবিসির তথ্যচিত্রটিকে নজিরবিহীন ভাষায় আক্রমণ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, এটার টাইমিং মোটেও ‘অ্যাক্সিডেন্টাল নয়’ এবং এটা হল আসলে ‘আরেকটা কায়দায় রাজনীতি করা’।
ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিবিসির প্রতি ইঙ্গিত করে জয়শঙ্কর আরও বলেছেন, যাদের সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নামার সাহস নেই তারাই এভাবে এনজিও বা সংবাদমাধ্যমের আড়াল নিয়ে রাজনীতি করে থাকে।
গত মাসে যুক্তরাজ্যে বিবিসির ওই তথ্যচিত্রটির প্রথম পর্ব সম্প্রচারিত হওয়ার পরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটিকে একটি ‘প্রচারধর্মী কাজ’ ও ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচায়ক’ বলে খারিজ করে দিয়েছিল।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এখন যে ভাষা ও ভঙ্গী ব্যবহার করে সরাসরি বিবিসিকে আক্রমণ করেছেন, তা ভারতেও প্রায় অভূতপূর্ব।
গত সপ্তাহে বিবিসির দিল্লি ও মুম্বাই অফিসে ভারতের আয়কর দফতর যে ‘সার্ভে’ চালিয়েছে তা নিয়ে কিন্তু জয়শঙ্কর কোনও মন্তব্য করেননি। বিষয়টি অবশ্য সরাসরি তার মন্ত্রণালয়ের অধীনেও পড়ে না।
এদিকে ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক এন রাম বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলে দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির সমর্থক ও অনুগামীদের কাছে তার ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করে তুলতেই বিবিসির দফতরে আয়কর হানা চালানো হয়েছে।
ভারতের প্রথম সারির সম্পাদকদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়ে মন্তব্য করলেন, যদিও ভারতের এডিটর্স গিল্ডের পক্ষ থেকে এর আগে এই পদক্ষেপের নিন্দা করে সাংগঠনিকভাবে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে মঙ্গলবার রাতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসির পাশে থাকার বার্তা দিয়ে বলেছে, তারা চায় বিবিসির সম্পাদকীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকুক।
ঠিক কী বলেছেন জয়শঙ্কর?
‘পডকাস্ট উইথ স্মিতা প্রকাশ’ অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, একটা তথ্যচিত্রকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা কিংবা বিশেষ কোনও চ্যানেলকে ভারতে সম্প্রচার করতে না-দেওয়া – এই সব পদক্ষেপকে তিনি কতটা সমীচীন মনে করেন?
জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, “একটা কথা আছে না, অন্য কায়দায় যুদ্ধ করা? এটাকে আমি বলব অন্য কায়দায় রাজনীতি করা। হঠাৎ করে কেন এই সব রিপোর্ট, মতামত, বক্তব্যের ধূম পড়ে গেল? এগুলো যে সামনেও আবার হবে না তাই বা কে বলতে পারে?”
“আপনি একটা ডকুমেন্টারি বানাবেন? বেশ, ১৯৮৪তে দিল্লিতে তো অনেক কিছু ঘটেছিল। সেগুলো নিয়ে আমরা কেন কোনও ডকুমেন্টারি দেখছি না?”, প্রায় চার দশক আগেকার ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর শিখ-বিরোধী দাঙ্গার দিকে ইঙ্গিত করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন তিনি।
বিবিসির ডকুমেন্টারি ঠিক এই সময়েই আসাটা যে নিছক সমাপতন বলে তিনি মনে করেন না, সেটাও স্পষ্ট করে দেন মি. জয়শঙ্কর।
তার কথায়, “আপনি কি মনে করেন (এই তথ্যচিত্রের) টাইমিংটা নেহাতই অ্যাক্সিডেন্টাল? তাহলে একটা কথা বলি, ভারতে নির্বাচনী মরশুম শুরু হয়ে গেছে কি না বলতে পারবে না, লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে কিন্তু সেটা নির্ঘাত শুরু হয়ে গেছে।”
নয়তো বিশ বছর আগেকার একটা ঘটনা এখন শুধু ‘সত্যের সন্ধান’ করতে তুলে আনা, এটা মোটেই বিশ্বাস্য নয় বলেও যুক্তি দেন মি, জয়শঙ্কর।
দেশের বাইরে থেকে ভারতের একটা খুব চরমপন্থী ছবি তুলে ধরার একটা চেষ্টা বিগত এক দশক ধরেই চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বলেন, “ভারতের সরকার, ক্ষমতাসীন দল বিজেপি, প্রধানমন্ত্রী – সবাইকেই এইভাবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে।”
তার ভাষায় যারা এভাবে পর্দার আড়াল থেকে রাজনীতি করছে তাদের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “এই লোকগুলোর আসলে রাজনীতিতে আসার সাহস নেই। নিজেদের এনজিও বা মিডিয়া সংস্থা বলে তারা একটা টেফলন আস্তরণে মোড়া থাকতে চাইছেন – কিন্তু আসলে তারা স্রেফ রাজনীতিই করছেন।”
