ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের এক বছর

বিশ্বব্যবস্থা ওলটপালটের যুদ্ধ

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:৪২

করোনা মহামারি থেকে মানুষ তখনো মুক্তি পায়নি। এরই মধ্যে ২৪ জানুয়ারি ভোরে যখন ইউক্রেনের অধিকাংশ মানুষ ঘুমাচ্ছিলেন তখনই রাশিয়ার হামলায় কেঁপে ওঠে অনেক এলাকা। ঘুম থেকে জেগে ওঠে ইউক্রেনবাসী। তবে এই হামলা কেবল ইউক্রেনের ঘুমই ভাঙায়নি, পুরো বিশ্বের মানুষকে বেঁচে থাকার সংগ্রামে যুক্ত করেছে। যুদ্ধটা ইউরোপের হলেও প্রভাব পড়েছে পুরো বিশ্বের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব। বেড়েছে পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকি। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি সেই ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকী।

এক বছর আগে ভাবা হয়েছিল যুদ্ধটা বেশি দিন স্থায়ী হবে না। রাশিয়া সহজেই জয় পাবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। যুদ্ধের বার্ষিকী উপলক্ষে ইউক্রেনে হঠাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সফর ও রাশিয়ার জয়ী না হওয়ার হুঁশিয়ারি, রাশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসা, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা এবং রাশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদের মন্তব্য বিশ্বকে টালমাটাল পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে। এই যুদ্ধ বিশ্বে বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে এসেছে যা এর আগের কোনো যুদ্ধে দেখা যায়নি।

ইউক্রেনের সুমি শহর।

বৈশ্বিক জোটে পরিবর্তন

বিশ্ব এখন তিনটি ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ ইউক্রেনকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে। দ্বিতীয় পক্ষ সেই সমর্থনের বিরোধিতা করছে এবং তৃতীয় পক্ষ নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে যুদ্ধ বন্ধের মধ্যস্থতা করছে। লন্ডন ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের ইউরোপ প্রোগ্রামের রিসার্চ ফেলো পেপিজন বার্গসেনের মতে, ইউরোপ যুদ্ধের সমাপ্তির চেষ্টা চালিয়েছে এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে।

রাশিয়ার হামলার এক সপ্তাহ পরই জাতিসংঘে একটি নিন্দা প্রস্তাব পাশ হয়। সেখানে ৩৫টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। এর মধ্যে তিনটি কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র-দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান এবং ভারত। এশিয়ার মধ্যে সিঙ্গাপুর, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াই ইউক্রেনের পক্ষে। এশিয়ার বৃহৎ শক্তি চীন, ভারত এবং ইন্দোনেশিয়া কোনো পক্ষ নিতে অস্বীকার করেছে। চ্যাথাম হাউজের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক পরিচালক বেন ব্রান্ড বলছেন, এশিয়ার একটা বড় অংশ পশ্চিমাদের যুদ্ধের কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোয় উন্নতির দিকে যাওয়া রাশিয়াকে অংশীদার হিসেবে পেতে চায়। বিশেষ করে এসব দেশ অর্থনীতি, সামরিক এবং কূটনীতির সমন্বয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

এশিয়ার চিত্র আফ্রিকার দেশগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কারণ ভোটদানে বিরত থাকা দেশগুলোর ৫১ শতাংশই আফ্রিকার। দেশগুলো স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক কোনো জোটে না গিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চায়। তবে রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে লাভবান হয়েছে ইরান। তুরস্কও কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শস্য রপ্তানি চুক্তি করতে মধ্যস্থতা করেছে। রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশ্বে একক কোনো দেশের চোখ রাঙানি বন্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী মাসে মস্কো সফরের পরিকল্পনা করছেন। চীন রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম দিচ্ছে বলেও দাবি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র করার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের আগে পুতিন ভাবতেই পারেননি যে, পশ্চিমা বিশ্ব এতটা ঐক্যবদ্ধ হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ

রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার আগে ইউরোপ বিশেষ করে জার্মানি এবং ফ্রান্স তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন ছিল না। কিন্তু এখন পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও মলদোভার মতো দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি বুঝতে পেরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলো এখন তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির দুই তৃতীয়াংশ করার ঘোষণা দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ইউরোপিয়ান পিস ফ্যাসিলিটির বাজেট থেকে খুব কমই ব্যয় করা হতো। এখন সেই বাজেট থেকে ইউক্রেনকে প্রতিরক্ষা খাতে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ন্যটোও তার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে। রাশিয়ার ভয়ে ফিনল্যান্ড সুইডেন ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার আবেদন করেছে। চ্যাথাম হাউজের আমেরিকান প্রোগ্রামের পরিচালক ড. লেসলি ভিনজামুরি মনে করেন, এতদিন ইউরোপের নিরাপত্তাকে অবহেলা করে আমেরিকা নিরাপত্তার শৃঙ্খলাকেই অবজ্ঞা করেনি, ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় চীনের প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকি ও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা

স্নায়ুযুদ্ধের পর রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি হওয়ায় এর আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে গিয়েছিল। এ নিয়ে তেমন আলোচনাও ছিল না। এখন পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকি বেড়েছে। কারণ রাশিয়া পরমাণু অস্ত্রের চুক্তি থেকে সরে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়া কখনো জয়ী হবে না। একই দিন সাবেক রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, এই যুদ্ধে পরাজিত হলে রাশিয়া নামের দেশটি হারিয়ে যাবে। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তাই বিশ্বের মানচিত্রে রাশিয়ার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। এছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ রাশিয়াকে এই যুদ্ধে জিততেই হবে—এমন সংকল্প নিয়ে বসে আছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। এর আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছিলেন, গত ৬০ বছরে এই প্রথম পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বেড়েছে। পুতিন তার পরমাণু বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করলে কী জবাব দেওয়া হবে সেই পরিকল্পনা সাজাচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব।

সোভিয়েত একাডেমি অব সায়েন্সেসে জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা পাভেল ফেলগেনহাওয়ারের মতে, যতটা ভাবা হয়েছিল, রাশিয়া আসলে ততটা শক্তিশালী নয়, যা ইতিমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা গেছে। আবার রাশিয়া অতটাও দুর্বল নয়। তাই রাশিয়াকে একদম খারিজ করে দেওয়া যায় না। তার মতে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে চলতি বছরে শেষ হওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। পুতিন কেন যুদ্ধে গেলেন? এমন প্রশ্নে পাভেল বলেন, এখানে একটি সামরিক কারণ আছে। মস্কোকে নিশানা করে ইউক্রেনে পশ্চিমাদের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঝুঁকি রোধে তিনি এই যুদ্ধে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি এক বছর আগে কিয়েভের পতনের আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। সেই তিনিই এখন বলছেন, রাশিয়া এই যুদ্ধে কৌশলগতভাবে, কারিগরিভাবে হেরে গেছে। এখন দুই পক্ষ জয়ী হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি

জ্বালানি ও খাদ্যের সংকট বাড়িয়েছে

রাশিয়া এবং ইউক্রেন এমন দুটি দেশ যারা বিশ্বের খাবার এবং জ্বালানির অনেকটাই সরবরাহ করে। সেই দেশ দুটিই সংঘাতে জড়িয়েছে। এর আগে ইরাক, আফগানিস্তানে আমেরিকা হামলা চালালেও বিশ্বে এতটা প্রভাব পড়েনি। এমনকি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও বিশ্বকে আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তেমন একটা নাড়া দেয়নি। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ খাদ্য ও জ্বালানির দাম এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে জীবন রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। হামলার প্রথম দিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়। উন্নত এবং উন্নয়নশীলসহ গোটা বিশ্বেই খাবার ও জ্বালানির দাম উচ্চহারে বাড়িয়েছে। জ্বালানিতে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে ইউরোপকে। কারণ ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। রাশিয়া জার্মানিসহ তার অনেক প্রতিবেশীকে জ্বালানির জন্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপাদানের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই নির্ভরতা ভবিষ্যতে ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন। কারণ বিশ্বে সোলার প্যানেলের ৭০ শতাংশ উৎপাদন করে চীন। ফলে মোজাম্বিক এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো লাভবান হতে শুরু করেছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন গ্যাস এবং তেলকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে রাশিয়া কিছু দিনের জন্য লাভবান হয়। যুদ্ধের আগের চেয়েও রাশিয়া ২৮ শতাংশ লাভ করে এই খাতে। কিন্তু এখন ক্রেতা দেশগুলো নিজ থেকে সরে যাওয়ায় আবার লাভের হার কমে যাচ্ছে। রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক এখন চীন। দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছরের চুক্তিও হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ খাদ্যসংকট চরম আকারে বাড়িয়ে দিয়েছে। আফ্রিকার ৮৫ শতাংশ মানুষ আমদানি করা গমের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, পাঁচ বছর আগে যে পরিমাণ মানুষ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় ছিল, এখন তার চেয়ে ১০ গুণ বেড়েছে। মূলত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই খাবারের দাম বাড়িয়েছে। কারণ খাবারের দাম বাড়লে সারের দাম বাড়ে ও পরিবহন খরচ বাড়ে। ফলে কৃষক এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও বিক্রেতারা লাভের জন্য খাদ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

জার্মান ইকোনোমিক ইনস্টিটিউট এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশ্ব তার জিডিপির এক তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, জ্বালানির উচ্চ দামই উৎপাদন কমাতে এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে ২ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায় বিশ্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। ফলে পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।

হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি

মার্কিন সামরিক বাহিনীর হিসাব মতে, ইউক্রেনের ৪০ হাজার বাসিন্দা নিহত হয়েছেন। সম্ভবত ইউক্রেনের ১ লাখ সৈন্য হতাহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ কোটি ১৪ লাখ ইউক্রেনিয়ান। গত বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাংক, ইউরোপিয়ান কমিশন এবং ইউক্রেন সরকারের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউক্রেনের সরাসরি ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি ডলার। বাড়ি-ঘর ধ্বংসে ক্ষতি হয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলার, পরিবহন এবং অবকাঠামো খাতে ৩০ বিলিয়ন ডলার, বাণিজ্য এবং শিল্পখাতে ১০ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি খাতে ক্ষতি হয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া কৃষি, ভূমি এবং জনগণের ক্ষতি হিসাব করলে ক্ষতির পরিমাণ ২৫০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৩৫০ বিলিয়ন ডলার।

গত নভেম্বরে ফোর্বস ম্যাগাজিন জানিয়েছিল, রাশিয়া ৯ মাসে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যয় করেছে ৮২ বিলিয়ন ডলার। সেনাবাহিনীর জন্য প্রেসিডেন্ট পুতিন ২৯ বিলিয়ন ডলার, সৈন্যদের বেতনে ১৬ বিলিয়ন ডলার, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈন্যদের পরিবারের জন্য ৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। আর আহত সৈন্যদের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ইউক্রেনের মাটিতে রাশিয়ার প্রচুর সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। এ আর্থিক মূল্য আনুমানিক ২১ বিলিয়ন ডলার। মস্কোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৫৪৯ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এর অর্ধেকই জব্দ করেছে ইউক্রেন মিত্ররা। মার্কিন সামরিক বাহিনীর হিসাব মতে, রাশিয়ার প্রায় ২ লাখ সৈন্য হয় নিহত বা আহত হয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন চলতি বছরের যুদ্ধের জন্য ১৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা বাজেটে পুতিনের ২০২৩ সালের বরাদ্দ ১৫৫ বিলিয়ন ডলার।

ইউক্রেনের হোস্টোমেলে অ্যান্টোনভ বিমানবন্দরের দক্ষিণ প্রান্তের স্যাটেলাইট ছবি। ছবি: ম্যাক্সার টেকনোলজিস/ইপিএ-ইএফই

ইউক্রেনকে নজিরবিহীন সহায়তা

এর আগে ইরাক, আফগানিস্তান এবং সিরিয়ার যুদ্ধ বিশ্বে এতটা প্রভাব ফেলেনি। আবার এসব দেশের পক্ষে উন্নত দেশ তথা পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্ব নজিরবিহীন সহায়তা দিচ্ছে। সহায়তার ক্ষেত্রে সবার ওপরে আছে যুক্তরাষ্ট্র। জার্মান রিসার্চ ইউনস্টিটিউট কেইল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনোমি গত ডিসেম্বরে করা এক হিসাবে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ২৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য ৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার, জার্মানি ২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান তহবিলের অধিকাংশই দিয়েছে লন্ডন এবং বার্লিন। ইইউভুক্ত দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক-সহায়তা হিসেবে দিয়েছে ৯ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। আর ইউরোপিয়ান পিস ফ্যাসিলিটির সহায়তা যুক্ত করলে ১২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। —সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স ও চ্যাথাম হাউজ

ইত্তেফাক/এমএএম