বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

খালেদার রাজনীতি: সিদ্ধান্ত আইনগত, না রাজনৈতিক?

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২:০০

বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নির্বাচন এবং রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরাই দুই ভাগ হয়ে পড়েছেন।

কয়েকজন মন্ত্রী বলছেন, খালেদা দিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি রাজনীতিও করতে পারবেন না, নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবেন না। আর কয়েকজন মন্ত্রী বলছেন, রাজনীতিতে বাধা নেই, তবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না খালেদা জিয়া।

তবে আইন বিশ্লেষকেরা একমত যে, খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে বাধা নেই। কিন্তু খালেদা জিয়ার চূড়ান্ত দণ্ড এবং দণ্ড স্থগিতের আইনগত ব্যাখ্যায় তাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি ছিলেন।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে শর্ত সাপেক্ষে ছয় মাসের মুক্তি পান। তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে দণ্ড স্থগিত করে এই মুক্তি দেওয়া হয়।

এরপর খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের আবেদনে এই মেয়াদ বাড়ানোয় এখনো তিনি কারাগারের বাইরে আছেন। খালেদা জিয়া দলের চেয়ারপার্সন হলেও দণ্ডের পর দেশের বাইরে অবস্থানরত তার বড় ছেলে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও দণ্ডপ্রাপ্ত।

সাম্প্রতিক বিতর্ক

সম্প্রতি খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে সরকারের মন্ত্রীরা এ নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। বিএনপিও এর জবাবে কথা বলেছে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া)  নির্বাচন করতে পারবেন না। তার কারণ উনি দণ্ডিত। রাজনীতি করতে পারবেন না, এরকম কথা তো কোথাও নেই। আইনি হলে তিনি রাজনীতি করতে পারবেন। বাস্তব অবস্থা হলো তিনি অসুস্থ হওয়ার কারণে দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়েছিল। এটা মনে রাখতে হবে। স্বাভাবিক মানুষ মনে করে তিনি অসুস্থ হওয়ায় রাজনীতি করতে পারবেন না। এটা হচ্ছে প্রাকটিক্যাল পজিশান।’

খালেদা জিয়া।

এদিকে খালেদা জিয়ার রাজনীতি ও নির্বাচন কোনোটিই করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার দণ্ড দিয়েছেন আদালত। তিনি সেই দণ্ড থেকে মুক্তি পাননি। মানবিক কারণে সরকার তাকে বাসায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। তাহলে তার রাজনীতি করার প্রশ্ন আসে কোথা থেকে? দণ্ডিত একজন কয়েদি হিসেবে খালেদা জিয়ার রাজনীতি করার সুযোগ নেই।’

এদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনীতি করতে বাধা নেই। তিনি জেলে থেকেও দল পরিচালনা করতে পারবেন, বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে পারবেন। তবে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।’

তবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কেউ যদি দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন, তাহলে তিনি নির্বাচন করতে পারেন না। খালেদা জিয়া দুই বছরের অনেক বেশি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। সুতরাং নির্বাচন করার প্রশ্নই আসে না। তার শারীরিক অবস্থা এবং বয়স বিবেচনায় তাকে শর্ত সাপেক্ষে কারাগারের বাইরে ঘরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেই শর্ত অনুযায়ী তিনি রাজনীতিও করতে পারেন না।’

এসবের জবাবে বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিএনপি চেয়রপার্সন খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হননি। পরিবেশ সৃষ্টি হলে অবশ্যই তিনি রাজনীতি করবেন।’

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনীতি করতে পারা-না পারার ব্যাপারে কয়েক দিন ধরে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যেসব কথা বলছেন, এসব বক্তব্যের ব্যাপারে বিএনপি আগ্রহী নয়।’

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা যখন স্ববিরোধী কথা বলছেন, তখন প্রমাণ হয় যে, অনির্বাচিত এই সরকার দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির অভাব থেকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানা অযৌক্তিক কথা বলছেন।’

তার কথা, ‘বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ এবং সে কারণে তিনি রাজনীতির মাঠ থেকে দূরে আছেন।’

খালেদা জিয়া।

তিনি বলেন, ‘সরকার খালেদা জিয়াকে সাজা থেকে রেহাই দেয়নি। শুধু শর্ত সাপেক্ষে তাকে বাসায় থাকতে দিয়েছে। ফলে তিনি কারামুক্ত নন। যে কারণে বিএনপির চলমান আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি রয়েছে।’

হঠাৎ কেন এই আলোচনা

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘আসলে সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির চলমান আন্দোলনে বিভ্রান্তি ছাড়াতেই সরকারের মন্ত্রীরা এসব অসংলগ্ন কথা বলছেন। তাদের নিজেদের কথায়ই মিল নাই। আগে বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না। এখন বলছেন রাজনীতিও করতে পারনে না। আসলে তারা ধুম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসব বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, ধুম্রজাল ছড়িয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করা যাবে না।’

তিনি দাবি করেন, ‘খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ওয়ান ইলেভেন সরকার ‘মাইনাস টু' থিওরি বাস্তবায়ন করতে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা দুইজনের বিরুদ্ধেই মামলা দিয়েছে। কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার মামলা প্রত্যাহার করেছে আর খালেদা জিয়ার মামলা প্রত্যাহার না করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে শাস্তি দিয়েছে।’

তার কথা, ‘১০ দফাসহ খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। আমরা সরকারের মন্ত্রীদের কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমরা খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাই।’

এর জবাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘মন্ত্রীরা নিজেরা খালেদা জিয়ার বিষয়টি সামনে আনেননি। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছেন, তার জবাবে মন্ত্রীরা কথা বলেছেন। এখানে ধুম্রজাল বা বিভ্রান্তির কোনো বিষয় নেই।’

তার কথা, ‘বিএনপি আইন, সংবিধান কিছুই মানে না। খালেদা জিয়া তো দন্ডপ্রাপ্ত। তার পরিবারের আবেদনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দিয়েছেন। তাকে তো শর্ত মানতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘জেলখানায় থেকে তিনি কীভাবে রাজনীতি করবেন? আদালত তাকে জামিন না দিলে তিনি তো বাইরে আসতে পারবে না। আর আইন অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তির তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তারেক রহমানের ব্যাপারটাও একই রকম।’

বিশ্লেষকেরা কী বলছেন?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, ‘খালেদা জিয়ার বিষয়টি আইনগত নয়, রাজনৈতিক। খালেদা জিয়াকে মানবিক কারণেও সুপ্রিম কোর্ট জামিন দেয়নি। তবে এর কিছুদিন পর সরকার তাকে সাজা স্থগিত করে মুক্তি দিলো। এখানে তো আইন থাকে না। রাজনীতির মধ্যে চলে আসে। রাজনীতিতে অনেক কথাই হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশ বলছেন, তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না। আরেক অংশ বলছে রাজনীতিও করতে পারবেন না।’

তার কথা, ‘সজাপ্রাপ্ত হলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধা আছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার সাজা তো চূড়ান্ত নয়। তার আপিল পেন্ডিং আছে। আর সরকার তার দণ্ড তো স্থগিত করেছে। ফলে তিনি দণ্ডের মধ্যে নেই। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার  হলে তিনি আবার সাজার মধ্যে চলে যাবেন। তিনি প্রার্থী হলে আদালত হয়তো এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু রাজনীতি করায় কোনো আইনে কোনো বাধা নেই।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন মনে করেন, ‘খালেদা জিয়ার দণ্ড স্থগিত হলেও তিনি দন্ডপ্রাপ্ত। তিনি দণ্ডের মধ্যেই আছেন। কারণ তার সাজা তো বাতিল হয়নি। করোনার সময় মানবিক কারণে দণ্ড স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আর দুই বছরের বেশি দণ্ড হলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যায় না।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের দণ্ড, না চূড়ান্ত দণ্ড কোনটা বিবেচনায় নেওয়া হবে এটা নিয়ে দ্বিমত আছে। কেউ মনে করেন বিচারিক আদালতের আবার কেউ মনে করেন চূড়ান্ত আদালতের। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দুই ধরনের উদাহরণই আছে। হয়তো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের কাছে খালেদা জিয়াকে যেতে হতে পারে যদি তিনি প্রার্থী হতে চান।’

আর রাজনীতি করার ক্ষেত্রে দণ্ডের বিষয়টি বাধা হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন আইনের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো আইনি বাধা আছ বলে আমার জানা নেই।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম