সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে উত্তরা এলাকা দিয়ে বাসে করে যাচ্ছিলেন সৈয়দ মাহমুদুল হাসান। বাসে জানালার পাশের সিটে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। বাসটি উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় পৌঁছলে বাইরে থেকে জানালায় হাত গলিয়ে মাহমুদুলের মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয় এক ছিনতাইকারী। এতে হতভম্ব হয়ে পড়েন মাহমুদুল হাসান।
এরপর চেঁচিয়ে ছিনতাইকারী বললেও বাস থেকে নামার সুযোগ পাননি এই ভুক্তভোগী। ততক্ষণে মোবাইল ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাই চক্রের সদস্যরা। এর পর বাস থেকে নেমেই তিনি উত্তরা পশ্চিম থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়ারি (জিডি) করেন। কিন্তু এত দিনেও তার ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে উত্তরা আজমপুর, হাউজবিল্ডিং হয়ে আব্দুল্লাহপুর ও টঙ্গী পর্যন্ত সড়কে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। মোবাইল ফোন ছাড়াও যাত্রীদের অনেক মূল্যবান জিনিসও ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারী ও টানা পার্টির সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের পর ছিনতাইকারী ও টানা পার্টি চক্রের সদস্যদের উত্পাত কিছুটা কমলেও তা একেবারে নির্মূল হচ্ছে না। কিছুদিন পর আবারও শুরু হয়ে যায় ছিনতাই চক্রের সদস্যদের দৌরাত্ম্য।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের পশ্চিম পাশের এলাকা, ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকা, আদাবর, শ্যামলী থেকে রিং রোডের বিভিন্ন অলিগলি, জাকির হোসেন রোড, বাঁশবাড়ির চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রায় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচটি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরাই ছিনতাই কাজে জড়িত রয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, চিহ্নিত এলাকাগুলোতে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়াও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত পর্যন্ত রাজধানীর কোতোয়ালি, মতিঝিল, খিলগাঁও, রামপুরা, হাতিরঝিল, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর ও ওয়ারী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী চক্রের মূলহোতাসহ ৩২ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৩)। অভিযানে তাদের কাছ থেকে সুইচ গিয়ার, চাকু, ক্ষুর, অ্যান্টিকাটার, কাঁচি, ব্লেড, ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন এবং নগদ টাকাসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়।
সাধারণত এসব এলাকায় ছিনতাইকারী এই চক্রটির সদস্যরা ঘোরাফেরা করতে থাকে। এছাড়াও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের অন্য সদস্যরা বিভিন্ন অলিগলিতে ওঁত পেতে থাকে। সুযোগ পাওয়া মাত্রই তারা পথচারী, রিকশা আরোহী, যানজটে থাকা সিএনজি, অটোরিকশার যাত্রীদের ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়। আবার চলন্ত বাস, সিএনজি অটোরিকশা থেকে হাত গলিয়ে ছোঁ মেরে মোবাইল, মানিব্যাগসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
র্যাব জানায়, রাজধানীর কোতোয়ালি, মতিঝিল, খিলগাঁও, রামপুরা, হাতিরঝিল, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর ও ওয়ারী এলাকার বিভিন্ন নির্জন জায়গাতে সন্ধ্যা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। টার্গেট করে আগে থেকে ব্যক্তিদের অনুসরণ চালায় ছিনতাই চক্রের সদস্যরা। তারা টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে গিয়ে নিজে থেকেই বিভিন্ন ধরনের কথা বলে শুরু করেন। একপর্যায়ে কথা বলতে বলতে ঐ ব্যক্তিকে সুবিধামতো কোনো জায়গায় নিয়ে যায়। এর পর চক্রের অপর সদস্যরা সেখানে এসেই তর্কবিতর্ক শুরু করে। এর পর মারধর চালায় ভুক্তভোগীর ওপর। ততক্ষণে ছিনতাইয়ের কাজটি তাদের চক্রের কেউ একজন সেরে ফেলে। তাদের ছিনতাইকাজে বাধা দিলে তারা নিরীহ পথচারীদের মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে ৭৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ২৬৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে র্যাব-৩।
তিনি বলেন, ‘যখনই রাজধানীতে ছিনতাইকারী চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় তখনই আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করি। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে র্যাবের সাঁড়াশি অভিযান চলমান রাখা এবং এসব ছিনতাইকারীকে আইনের আওতায় আনতে আমরা চেষ্টা করছি।’
