নির্বাচনি ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পরও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্বাধীন ও সার্বভৌম কমিশনকে এমনিতেই বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এরপরেও বিজয়ী প্রার্থীর নাম সংবলিত নিজেদের গেজেট ইসি নিজেই বাতিল করলে তা নিয়ে নানা বিতর্ক হতে পারে বলেও আইনজ্ঞরা মনে করছেন। তারা বলছেন, এতে এই আইনের নানা ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যাবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজেদের গেজেট নিজেরাই বাতিল করে দেওয়া মানে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন নিজেই নিজের বিচার করছে। এটা বর্তমান যে নির্বাচনি আইন আছে তার মূল চেতনার পরিপন্থি ।
প্রসঙ্গত, ফলাফলের গেজেট প্রকাশ হওয়ার পরও তা বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশন (ইসি) পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ভোট বাতিলের ক্ষমতাসংক্রান্ত ঐ সংশোধনী প্রস্তাবে আইন মন্ত্রণালয়ের সায় মিলেছে বলেও জানান তিনি। গেজেটের পর ভোট বাতিলের ক্ষমতা প্রদানের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে ময়মনসিংহের দুর্গাপুরের একটি ঘটনা টেনে এই কমিশনার বলেন, ‘আমি যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই একটা ফাইল এলো। এতে দেখলাম যে ময়মনসিংহের দুর্গাপুরে একটা নির্বাচনে বোধহয় ব্যালট ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। তখন কমিশন গেজেট হওয়ার পর ভোট বাতিল করেছিল। কিন্তু হাইকোর্ট বলে দিলেন যে গেজেট হওয়ার পর কমিশনের করার কিছু থাকে না। আমরা এজন্য কমিশনের হাতে ক্ষমতা যেন থাকে এই প্রস্তাব করেছিলাম। তাতে সায় দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেছেন, নিজের গেজেট নিজেই বাতিল করে দেওয়া মানে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন নিজেই নিজের বিচার করছে। গেজেট প্রকাশের মানে হচ্ছে কাউকে একটি অধিকার দিয়ে দেওয়া। এই অধিকার নির্বাচন কমিশন কেড়ে নিতে পারে না। এটা ন্যাচারাল জাস্টিসের পরিপন্থি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের গেজেট বাতিলের ক্ষমতা একমাত্র নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল কিংবা উচ্চ আদালতের হাতে থাকা উচিত। নির্বাচন কমিশন তো নিজেই নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে না। যদি আইন করে তাদেরকে গেজেট বাতিলের ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে এ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমরা জানি নির্বাচনি ফল ঘোষণার পর গেজেট হলে সেটা সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে কোন অনিয়মের অভিযোগে যদি গেজেট প্রকাশের পর ভোট বাতিল করা হয় তাহলে উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়া উচিত। যদি সেই সুযোগ না দিয়ে এভাবে ভোট বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয় তাহলে তা অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, এমপি নির্বাচন চ্যালেঞ্জ করতে হলে হাইকোর্টে মামলা করতে হয়। আর এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হলে ইসির উচিত হবে উভয় পক্ষকে যুক্তিসংগত সময় দিয়ে শুনানি করে নির্বাচন বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, আইনের খসড়াটা এখনো দেখিনি। শুধু গণমাধ্যমে পড়েছি। তিনি বলেন, এ ধরনের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হলে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা খর্ব হবে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের মামলা। অ্যাডভোকেট খুরশীদ বলেন, বর্তমান যে নির্বাচনি আইন আছে তার মূল চেতনার পরিপন্থি হবে। তবে ইসিকে এই ক্ষমতা দেওয়া হলেও অন্যান্য গেজেট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কোনো আশঙ্কা তিনি দেখছেন না।
নির্বাচনের বিষয়ে অভিজ্ঞ কয়েক জনের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তারা ইত্তেফাককে জানান, এমনিতেই নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া আছে। অনেক সময় দেখা যায় একটি কেন্দ্রের ফলাফল শিটে প্রিজাইডিং অফিসার, প্রার্থীর এজেন্টদের স্বাক্ষর থাকে। চূড়ান্ত ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হয়। রিটার্নিং অফিসার ঐ ফলাফল নির্বাচন কমিশনে পাঠান। নির্বাচন কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের আগে নির্বাচনি ফলাফলে কোনো অনিয়ম পেলে তদন্তসাপেক্ষে ভোট বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে ইসির। এই ক্ষমতা থাকার পরেও গেজেট প্রকাশের পর ভোট বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেও অনেক সময় ফলাফল এদিক সেদিক করে দেওয়া সম্ভব। অভিজ্ঞ মহল বলেন, প্রার্থীর কাছে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফলের একটি কপি থাকে। কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণার পর অনেক সময় ফলাফল শিটে যে ভোট সংখ্যা উল্লেখ থাকে তার সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের মিল থাকে না। এরপরেও প্রার্থী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল বা আদালতে মামলা করার সুযোগ পান।
