ভাব ও মরমী গানে মুখরিত লালন আখড়া 

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৩, ২২:০৮

বাউলের শিরোমনি ফকির লালন শাহের স্মরণোৎসব ঘিরে তিন দিনব্যাপী অয়োজিত অনুষ্ঠানে শনিবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় উদ্বোধনী দিনে ভাব-জগতের মরমী গান ও সুরের মূর্ছনায় মুখরিত কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া। অনুষ্ঠানে বাউল ভক্ত-অনুসারীদের পদচারনায় লালন মাজার পরিণত হয় মিলন মেলায়। বাউল-বাউলানী ও ভক্ত -অনুরাগীদের পদচারণায় তিল ধারনের ঠাঁই নেই লালন মাজারে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠান আগামী ৬ মার্চ শেষ হবে। 

সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুবউল আলম হানিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ, কুষ্টিয়া-৪ আসনের এমপি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জজ, এসপি খাইরুল আলম ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী। প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) অধ্যাপক ড. শাহিনুর রহমান। 

অন্যান্যের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আখতার, কুমারখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, মেয়র শামছুজ্জামান অরুন, পিপি এ্যাডভোকেট অনুপ কুমার নন্দী, নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এসএম মুস্তানজিদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিতান কুমার মন্ডলসহ অনেকে।
 
বক্তারা বলেন, লালন ফকির ছিলেন স্বশিক্ষিত। আত্ম পরিচয়ে তিনি ছিলেন নীরব। সাধক লালন মানব কল্যাণ ও সত্যানুসন্ধানের কথা বলে গেছেন। মানবতাবাদী গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির দ্বন্দ্ব ও হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে মানুষে মানুষে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন। জীবদ্দশায় তিনি সব সময় সত্যের অনুসন্ধান করেছেন। 

মরা কালি নদীর পাড়ে উন্মুক্ত মে প্রথম পর্বের আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় জমকালো লালনগীতির জলসা। প্রবীণ বাউল ও লালন একাডেমির শিল্পিরা উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন।

পরে রাতভর চলে মন মাতানো গান। দুর-দুরান্তের হাজার হাজার নারী-পুরুষসহ লালন ভক্তরা গান উপভোগ করতে অনুষ্ঠানস্থলে ছুটে আসেন। প্রবীণ বাউল শিল্পিসহ লালন একাডেমির শিল্পিদের পরিবেশনায় সঙ্গীতানুষ্ঠান দর্শক-শ্রোতারা গান উপভোগ করেন রাতভর। কখনও পিনপতন নিরবতা আবার কখনও শিল্পিদের পরিবেশিত গানের তালে তালে দর্শক-শ্রোতারাও নেচে-গেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠেন। 

‌‌‘আর কী বসবো এমন সাধুর সাধবাজারে/ আর কি হবে মানবজনম বসব সাধুর মেলে /হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায় ঘিরে নিল কালে/ খাঁচরা ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়/ কে বানাইলো এমন রংমহল খানা/মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষেরও সনে ইত্যাদি গানে গানে দর্শক-শ্রেতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মানবতাবাদী গানে হৃদয় ছঁয়ে যায় দর্শক-শ্রোতাদের। একতারা দ্বোতারা, ডাক-ঢোল ও বাঁশির সূরের মূর্চ্ছনায় দর্শক-শ্রেতাদের কাছে দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠে সংগীতানুষ্ঠান। 

কালিগঙ্গা নদীর পাড়ে গানের মূল অনুষ্ঠান ছাড়াও অডিটোরিয়ামের নিচতলায় উন্মুক্ত চত্বরে ও খণ্ড খণ্ড গানের আসরে মেতে উঠেন বাউলরা। পার্থিব সমস্ত কিছু ভুলে গিয়ে ফকির লালনের মানবতাবাদী ও মরমী গানের সুরের মধ্যে লালনের আধ্যাত্বিকতাকে খুঁজে পেতে একাত্ব হয়ে যান বাউলরা। বাউলদের মতে, লালন ভক্তরা সাঁইজির পূণ্যভূমিতে ছুটে আসে মনের টানে। আঁখড়বাড়িতে বাউলরা পালন করেন তাদের আচার-অনুষ্ঠান। লালন একাডেমির আয়োজনে ১০/১২ হাজার বাউল-ভক্তদের তিন বার খাবার দেওয়া হয়। ভোরের নাস্তা বাল্য সেবা (পায়েস), দুপুরের খাবার পূণ্যসেবা হিসাবে সাদা ভাত, মাছ, সবজি, ডাল ও দই এবং রাতের খাবার অভিবাসে দেওয়া হয় খিঁচুড়ি। লালন ফকিরের মাজার দর্শনসহ বাল্য সেবা, পূণ্যসেবা ও অধিবাসের খাবার বাউলদের অন্যতম কর্মযজ্ঞ। এ কাজ শেষ হলেই বাউলরা নিজ নিজ আশ্রমে ফিরে যান। এদিকে মরাকালী গঙ্গা নদী সংলগ্ন বিশাল মাঠে বসেছে চিরায়ত গ্রামীণ মেলা। মেলার প্রায় চার শতাধিক স্টলে বিভিন্ন জিনিস-পত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা। 

আধ্যাত্বিক সাধক ফকির লালনের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভক্তি ও তার মানবতাবাদী মরমী গান উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। লালন আখড়ায়। এ অনুষ্ঠান কোনো দাওয়াতপত্র ছাড়াই প্রাণের টানে বাউল-ভক্তরা অনুষ্ঠানে ছুটে আসেন। স্মরণোৎসব অনুষ্ঠান ঘিরে দর্শনার্থীদের পদচারণায় লালন আখড়া পরিণত হয়েছে মহামিলনের মহোৎসবে। 

ইত্তেফাক/পিও