টাইগার দলের তরুণ ব্যাটার তাওহীদ হৃদয়। গেল বিপিএলে ব্যাট হাতে দারুণ ফর্মে থাকায় পরবর্তী ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সিরিজে টাইগার দলে ডাক পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাওহীদের হয় টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক, সেবার ওয়ানডে সিরিজের তাকে রাখা হয়নি। তবে আয়ারল্যান্ড বিপক্ষে হৃদয়ের অভিষেক হয় ওয়ানডে সিরিজে। আর প্রথম ম্যাচেই নিজেরে দক্ষতা জানান দেন ২২ বছর বয়সি এই ডানহাতি ব্যাটার।
গত শনিবার আইরিশদের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ৯২ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন হৃদয়। আর তাতেই করে ফেলেন টাইগার দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচে সব থেকে বেশি রান করার রেকর্ড। এছাড়া এই ইনিংস খেলে তিনি হন ম্যাচ-সেরাও। পরে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে জানান তার নানা বাধাবিপত্তি ঠেলে উঠে আসার গল্প। এ সময় হৃদয় জানান ঢাকায় এসে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথাও।
তাওহীদ হৃদয় বগুড়ার সন্তান। একসময় তার ইচ্ছা ছিল বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার। তবে তার সেই শখ পূরণ হয়নি। তার বাবা ক্রিকেট বোঝেন না, তাই কোনো সময়ই তিনি পরিবার থেকে ক্রিকেটার হওয়ার পথে সহযোগিতা পাননি। তবে তার মায়ের সঙ্গে আবদার কিংবা জেদ করেই মানিয়ে নিয়েছিলেন ঢাকার এক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারটা। সে সময় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় বাবাকে না জানিয়ে জমি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে দেন মা। সেই টাকা দিয়ে হৃদয় ভর্তি হন ঢাকার বনশ্রীর একটি ক্রিকেট একাডেমিতে। কিন্তু পরে এসে দেখেন, সেই একাডেমি ভুয়া। এতে হতাশায় পড়ে যান হৃদয়। তিনি বলেন, ‘যখন একাডেমিতে গিয়েছিলাম, অনেক কিছু আসলে ক্ষতি করেই গিয়েছিলাম ওখানে। তারপর একটা সময় ক্রিকেট খেলার কোনো ইচ্ছা ছিল না। পরিবার থেকে ওভাবে কখনো সাপোর্ট ছিল না, বাবার সাপোর্ট ছিল না, যদিও বাবা-মা খেলা বোঝেন না। যখন জেদ ধরতাম মায়ের সঙ্গে, তখন মা যতটুকু পেরেছেন চেষ্টা করেছেন।’
এ সময় প্রতারিত হওয়ার পর হতাশায় খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে হৃদয় বলেন, ‘একটা সময় আমার খেলার ইচ্ছা ছিল না। সেই সময় সুজন স্যার সেই ছোটবেলাতেই, যখন আমি অনূর্ধ্ব-১৬ খেলি, তিনি ওখান থেকে নিয়ে এসেছেন এবং উনি আসলে সুযোগ করে দিয়েছেন। ওখান থেকে প্রথম বিভাগে খেলে আস্তে আস্তে উঠে আসা।’
তবে সে সময় পরিবারের সমর্থন না পেলেও বর্তমানে তার পরিবার খুশি। বিশেষ করে তার মা। হৃদয় বলেন, ‘আসলে প্রত্যেক বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়াই ভালো হওয়ার কথা (জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর)। আমার বাবা-মাও খুশি হয়েছেন। আমার মা বেশি খুশি হয়েছেন। আসলে উনি তো আমাকে ছোট থেকে বড় করেছেন। আমার পড়াশোনার জন্য উনি অনেক চাপ দিতেন। কিন্তু আমি আসলে পড়াশোনার দিকে অত বেশি মনোযোগী ছিলাম না। যতটুকু সময় পেতাম মাঠেই থাকতাম। আলহামদুলিল্লাহ, আমার বাবা-মা খুশি হয়েছেন। আশপাশের আত্মীয়স্বজনও খুশি।’
এর আগে চলতি বছরেরই গত ৮ জানুয়ারি সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে বিপিএলে সর্বপ্রথম সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন হৃদয়। এরপর আবার গত ১৮ মার্চ এলেন দ্বিতীয় বারের মতো। মাঝে কেটে গেছে ৭০ দিন। এই সময়টায় হৃদয়ের জীবনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। গায়ে জড়িয়েছেন জাতীয় দলের জার্সি। এই জার্নিটা ক্যামন কেটেছে জানতে চাইলে হৃদয় বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমার খুব ভালো গেছে, আমি সব সময় চেষ্টা করেছি, যখন যেই অবস্থায় থাকি ভালো কিছু করব। এই আশা নিয়েই সব সময় থাকি..... সবকিছুই উপভোগ করেছি।’
এ সময় টাইগার দলের অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমকে দেখে ক্রিকেটে অনুপ্রেরিত হওয়ার কথা জানিয়ে হৃদয় বলেন, ‘আমি অনেক ছোট ছিলাম, ২০০৭-এর একটা কাহিনি। মুশফিক ভাই বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে জিতে একটা স্টাম্প পেয়েছিলেন। তখন আমি অনেক ছোট, একদিন স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। একটা প্রোগ্রামে মুশফিক ভাইয়ের কাছে যখন স্টাম্প দেখেছিলাম, তখন থেকেই অনেক অনুপ্রাণিত হই। ওখান থেকেই ইচ্ছে ছিল, যদি আমি একদিন খেলতে পারি জাতীয় দলে।’ তবে এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ছোটবেলায় যাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন হৃদয়, তার কাছ থেকেই ওয়ানডে অভিষেকের ক্যাপটি পেয়েছেন। এছাড়া প্রথম ম্যাচেই মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে গড়েছেন ৪৯ বলে ৮০ রানের দুর্দান্ত এক জুটি।
