শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হত্যার পর বস্তাবন্দি লাশ নিয়ে গাড়িতে ঘুরছিলেন স্বামী-স্ত্রী

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৩, ০৫:৩৮

নিখোঁজের দুই দিন পর চালকের লাশসহ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিকিমথ কোম্পানির ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকালে পাবনার পাশে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ঘাট এলাকা থেকে লাশসহ প্রাডো গাড়িটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত গাড়িচালক সম্রাট হোসেন (২৯) ঈশ্বরদী পৌর শহরের মধ্য অরণকোলা (আলহাজ ক্যাম্প) এলাকার আবু বক্কার সিদ্দিকের ছেলে। এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত সম্রাটের বন্ধু একই উপজেলার বাঁশেরবাদা গ্রামের আব্দুল মমিনের স্ত্রী সীমা খাতুনকে (৩০) আটক করেছে। উল্লেখ্য, সম্রাট নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার বন্ধু মমিন পলাতক রয়েছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাটকে হত্যার কথা স্বীকারও করেছেন সীমা খাতুন। সীমা বলেছে, ‘সম্রাট তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্নভাবে প্ররোচনা ও ব্লাকমেইল করার কারণে তাকে হাতুড়ি দিয়ে মেরে হত্যা করেছি।’ কিন্তু অন্যদিকে সম্রাটের পরিবারের দাবি ৫০ হাজার টাকা পাওনার জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জিয়াউর রহমান জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে সম্রাট তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। এর পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খুঁজেও তাকে না পেয়ে তার পরিবার ঈশ্বরদী থানায় সাধারণ  ডায়ারি করেন। শনিবার সকালে শিলাইদহ ঘাট এলাকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি গাড়ি দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়।  পুলিশ সেখানে গিয়ে প্রাডো জিপের ভেতর থেকে সম্রাটের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহতের স্বজনেরা গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

সম্রাটের লাশের সুরতহাল করেন কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দীপঙ্কর দাস। তিনি বলেন, মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে তিনটি আঘাতের চিহ্ন আছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ আঘাতের কারণে সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড।

এর আগে বিভিন্ন সূত্র ধরে পুলিশ ঈশ্বরদী উপজেলার বাঁশেরবাদা এলাকার বাসিন্দা নিখোঁজ সম্রাটের বন্ধু আব্দুল মমিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার স্ত্রী সীমা খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পুলিশ ও পরিবারের ধারণা, সম্রাটের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে বন্ধু মমিন ও তার স্ত্রী সীমা মিলে সম্রাটকে হত্যা করেছে।

পুলিশের হাতে আটক সীমা খাতুন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে সম্রাটকে হত্যার কথা স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সম্রাট আমার বাসায় আসে। মাথা ধরেছে বলে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আমার স্বামী মমিন ওষুধ আনতে গেলে সম্রাট আমার শরীরে হাত দেয়। আমি রাগে ক্ষোভে হাতুড়ি দিয়ে তার মাথায় ও গোপনাঙ্গে আঘাত করলে সে মারা যায়। পরে আমার স্বামী বাসায় ফিরলে লাশ বস্তায় ভরে ঐ গাড়িতে তুলে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করি। এক পর্যায়ে আমার স্বামী আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে শিলাইদহে গাড়ি রেখে সটকে পড়ে।’

প্রাডো জিপ গাড়ির মালিক আনিসুর রহমান বলেন, আমার কয়েকটি গাড়ি রূপপুর প্রকল্পে বিভিন্ন কোম্পানিতে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। তিন বছর ধরে সম্রাট আমার ঐ প্রাডো গাড়িটি চালাত।

নিহত সম্রাটের বাবা আবু বক্কার বলেন, ‘আমার ছেলে সম্রাট তার বন্ধু মমিন ও মমিনের স্ত্রী সীমাকে চাকরি দিয়েছিল। তবে তাদের সেই চাকরি চলে যায়। সম্রাট আবারও তাদের শ্রমিক হিসেবে চাকরি পাইয়ে দেয়। আমার ছেলে নিকিমত কোম্পানিতে কয়েকটি গাড়ি ভাড়াও দিয়েছিল। প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকা বিল তুলত। গত বৃহস্পতিবার বিল হয়। কৌশলে আমার ছেলেকে স্বামী-স্ত্রী ডেকে নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাকে হত্যা করতে পারে বলে ধারণা করছি। আমার সন্তানের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

নিহত সম্রাটের মামা শামসুল হক দাবি করেন, ষড়যন্ত্র করে তাঁর ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে। ঈশ্বরদীতে এক নারীর কাছে তাঁর ভাগনে ৫০ হাজার টাকা পেতেন। ওই টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে।

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার গোস্বামী জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সীমা খাতুন স্বীকার করে যে সম্রাটকে তিনিই হত্যা করেছেন। আর লাশ বস্তায় ভরে প্রাডো গাড়িতে তুলে স্বামী মমিন নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে সীমা জানায়, বন্ধুত্বের কারণে সম্রাটের তাদের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এসুযোগে সম্রাট তার অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্নভাবে প্ররোচনা ও ব্লাকমেইল করছিল। এরই জের ধরে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে সম্রাটকে হত্যা করা হয়েছে ।

ঈশ্বরদী থানার ওসি অরবিন্দ সরকার বলেন, নিহত সম্রাটের পরিবার ও গাড়ির মালিকের তথ্যের ভিত্তিতে বাঁশেরবাদা এলাকায় মমিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে তার স্ত্রী সীমাকে আটক করা হয়। পলাতক মমিনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানাপুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

ইত্তেফাক/ইআ