কুষ্টিয়ার সর্ববৃহৎ জলমহাল বিগত দুই বছরেরও অধিক লিজবিহীন ভোগ দখল করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। এতে নিবন্ধিত প্রকৃত মৎস্য সমিতিভুক্ত অন্তত হাজার পরিবার জীবিকা হারিয়ে পথে বসেছে। প্রভাবশালীদের দাপট ও আইনি মারপ্যাঁচসহ নানা কারসাজিতে এই টানা দুই বছর জলমহালের ইজারা বন্ধে রাজস্ব ক্ষতিসহ প্রকৃত মৎস্যজীবীরা মাছচাষ, আহরণ ও বিপণন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া মাছ উৎপাদন-সংরক্ষণের এই অভয়াশ্রমে দেশি প্রজাতির মাছ উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহতসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা।
কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত কালীগঙ্গা-বাদলবাসা নামক ৬৫.৮৩ একর আয়তনের বৃহৎ জলমহালটি দেশিয় প্রজাতির রুই, কাতলা, কই, পাচিলা, সরপুঁটি, মলা, পাবদাসহ অন্যান্য মাছ চাষ ও সংরক্ষণের অভয়াশ্রম। এছাড়া এই জলমহালটি এলাকার বিপুল মৎস্যজীবীদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন।
মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, ক্ষমতার দাপট ও নানা কারসাজিতে দুই বছরের অধিক ওই জলমহালটি লিজবিহীন দখলে রেখেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল। বৃহৎ এই জলমহালটিতে ইজারা বন্ধে মাছ উৎপাদন থমকে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচনসহ জেলাবাসীর আমিষের চাহিদা মেটাতে সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের তড়িৎ পদক্ষেপের অভাবে প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর জলমহালটি দখলে রেখে হাতিয়ে নিচ্ছে অঢেল টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার ডিসি অফিসের রাজস্ব শাখার জারীকৃত টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি মতে জলমহালটি তিন বছর ইজারা নিতে আগ্রহীদের অনলাইনে আবেদন করার সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু প্রভাবশালীদের দাপটে ইজারা গ্রহণে আগ্রহীদের কেউ টেন্ডারে অংশগ্রহণ কিংবা শিডিউল জমা দেয়নি। এদিকে টেন্ডার আহ্বানের পর পরই মৎস্যজীবী দাবীদার মূসা আলী খান নামে এক প্রভাবশালী উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত জলমহালের ইজারা কার্যক্রম ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেন। ফলে আইনি জটিলতাসহ নানা কারসাজিতে চুক্তিপত্র ছাড়াই প্রভাবশালীরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে দুই বছরেরও অধিক দেশি মাছ চাষ-সংরক্ষণের অভয়াশ্রম এই জলমহালটি দখলে রেখে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল মুনাফা।
অভিযোগের ব্যাপারে রিটকারী মূসা আলী খানের সঙ্গে ইত্তেফাকের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে তিনি এ ব্যাপারে সংবাদ না করার অনুরোধ জানান এবং খুব শিগগির এ বিষয়ে সমাধানের কথা জানান।
কালিগঙ্গা-বাদলবাসা মৎস্য সমবায় সমিতির (নিবন্ধিত) সভাপতি মো. আবু হানিফ মোল্লা জানান, প্রকৃত মৎস্যজীবীরা এই জলমহাল থেকে এখন বিতাড়িত। প্রভাবশালীদের কালো থাবায় এই জলমহালের সাথে জড়িত অন্তত এক হাজার মৎস্যজীবী পরিবার কর্ম হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
কুমারখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো মাহমুদুল হাসান জানান, বিল-বাঁওড় মৎস্য উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় সরকারের সাথে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ-ড্যানিডা) সাথে ১৯৯৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভূমি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৫০ বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। দশ বছর পর চুক্তি নবায়নের শর্ত ছিল। কিন্তু ওই চুক্তির আওতায় ইফাদ কর্তৃপক্ষ ৩০ বছর পর প্রকল্পের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। ২০২১ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইস্যুকৃত চিঠিতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসককে ইজারার জন্য টেন্ডার দিতে বলা হয়। পরবর্তীতে টেন্ডার আহ্বান করা হলে ইফাদের সুফলভোগী সদস্য দাবীদার প্রভাবশালীদের আইনি মারপ্যাঁচে জলমহালটি ইজারা কার্যক্রম থমকে গেছে।
জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য-সচিব রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকী জানান, আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির জন্য ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইনি বাধা কাটিয়ে খুব শিগগির উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে জলমহালটি মৎস্যজীবীদের কাছে ইজারা দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জলমহাল কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম জানান, উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু টেন্ডার দেওয়ার পর পরই এক মৎস্যজীবী উচ্চ আদালতে রিট করায় আপাতত ওই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
