‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন

৩ শিক্ষার্থীকে রাতভর পেটানোর অভিযোগ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:১৮

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে ৩ ছাত্রকে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল) রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলে এই ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পুলিশের হাতে তুলে দেয় ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ভুক্তভোগীরা হলেন, লোকপ্রশাসন বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম রহমান জয় (২৫), ইংরেজি বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসাদুল ইসলাম (২৩) এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আজিজুল হক (২৩)। 

এদের মধ্যে আসাদুল ইসলাম ও আজিজুল হককে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আর গোলাম রহমানের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রলীগের নেতারা ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার এলাকা থেকে ৩ ছাত্রকে ধরে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলে নির্যাতন করে। খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে হলের প্রভোস্টকে নিয়ে প্রক্টর কামাল হোসেন সেখানে যান। তিনি থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে ওই ৩ ছাত্রকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে গোলাম রহমান অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতেই তাকে পুলিশ পাহারায় পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের একটি বেডে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন আহত গোলাম রহমান। তার হাত ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন। সেখানে ৫-৬ জন পুলিশ সদস্য পাহারায় রয়েছেন। 

পুলিশের সহকারী এএসআই সাগর হোসেন বলেন, তিনি সকালে ডিউটিতে এসেছেন। চিকিৎসক গোলাম রহমানকে ওষুধ দিয়েছেন।
 
এদিকে ভুক্তভোগী আসাদুল ও আজিজুল বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে তারাবির নামাজ শেষে ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে বসেছিলেন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলামসহ কয়েকজন এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে শিবির বলে ধরে নিয়ে বঙ্গবন্ধু হলে আটকে নির্যাতন করেন। তারা শিবিরের রাজনীতি করেন বলে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেন। পরে প্রক্টর এসে পুলিশে সোপর্দ করে। 

ভুক্তভোগী আসাদুল ইসলামের বাবা আবুল কালাম বলেন, আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে ছেলেকে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। আমার ছেলে কখনো শিবির করেনি। আমার ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিবিরের ১৫ নেতা-কর্মী ক্যাম্পাসে গোপন বৈঠক করছিলো। সাধারণ ছাত্ররা তাদের ধাওয়া করে। অন্যরা পালিয়ে গেলেও ওই ৩ জনকে আটক করে হলে নিয়ে আসে। পরে খবর পেয়ে প্রক্টরের সঙ্গে সেখানে যান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ ড. ওমর ফারুক বলেন, খবর পেয়ে হলে এসে ওই শিক্ষার্থীদের দেখতে পাই। তারা আমার হলের শিক্ষার্থী নয়, ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে। তারা নিজেদের শিবির বলে স্বীকারোক্তি দিলে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এখানে ছাত্রলীগ মারধর করেছে কিনা জানি না।

প্রক্টর কামাল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে তিনি  রাত ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু হলে যান। সেখানে ছাত্রদের উত্তেজিত অবস্থায় দেখতে পান । তারা ৩ ছাত্রকে আটক করে হইচই করছিলো। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা নাজমুল হোসেন বলেন, প্রক্টর ড. কামাল হোসেনের মাধ্যমে খবর পেয়ে ক্যাম্পাসে এসেছিলাম। পরে ওই শিক্ষার্থীদের আটক অবস্থায় দেখি। তাদের কাছে থেকে শিবিরের রিপোর্ট বই, ব্যক্তিগত ডায়েরি এবং মোবাইল উদ্ধার করা হয়। পুলিশের কাছে সোপর্দের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদেরকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।

পাবনা সদর থানার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা বলেন, ওই ৩ ছাত্রের কাছ থেকে শিবিরের রিপোর্ট বই পাওয়া গেছে। এখন ৩ জনের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শিবির ও নাশকতার কোনো অভিযোগ থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাবনার পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী বলেন, খবর পেয়ে আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর ভুক্তভোগীরা যদি অভিযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এবি/পিও