চঞ্চল চৌধুরীর গাড়িকাহিনী!

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:২৫

অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। এখন নাটকে তাকে বেশি দেখা যায় না। ওটিটির কাজ নিয়ে এখন বাংলাদেশ ও কলকাতায় সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেনো আজ সবার শীর্ষে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয় এই অভিনেতা। মাঝে মধ্যেই শেয়ার করেন ব্যক্তিগত জীবনের নানান কিছু। এবার তিনি কথা বললেন, সম্প্রতি বিক্রি করে দেওয়া দীর্ঘ ১৬ বছরের সঙ্গী তার গাড়িটি নিয়ে। অবশ্য এরজন্য তিনি বিরাট ইতিহাস টেনেছেন।

ফেসবুকে চঞ্চল চৌধুরীর পোস্টটি ইত্তেফাক অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

হাফ প্যাডেল, ফুল প্যাডেল করে ছোটবেলায় যখন সাইকেল চালানো শিখেছিলাম, তখনই মনের মধ্যে একটা বড় স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল, একদিন নিজের একটা সাইকেল হবে। কিন্তু হয়নি….। বাবার আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা বিবেচনা করে কোনদিন বাবাকে বলতে পারিনি। বাবা, একটা সাইকেল কিনে দাও। তখন হাই স্কুলে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল মাইল দুয়েক দূরে। অনেকেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতো আসতো, কিন্তু আমার ইচ্ছা তখন পূরণ হয়নি। ঠিক অন্যের মটর সাইকেল চেয়ে নিয়ে, চালানো শিখেছিলাম হাফ প্যান্ট পড়া কিশোর বয়সেই।

তখন রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতাম নিজের মটর সাইকেল চালাচ্ছি……। সে স্বপ্নও অধরাই থেকে গেছে। কারণ, আমাদের কোন সামর্থ্য ছিল না।
তারপর থেকে অসম্ভব কোন কিছু প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখিনি কোনদিন। ভাগ্য বা যোগ্যতায় যখন যতটা অর্জন করতে পেরেছি,সেটা নিয়েই খুব খুশী থেকেছি।
অভিনয়কে যখন আমি ভালোবাসা আর নেশার সঙ্গে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করলাম, তখন কোনদিনই নিজের একটা গাড়ি হবে একথা ভাবিনি।

পেশাগত কর্ম ব্যস্ততা যখন বাড়তে থাকলো, অভিনয়ে বড় বড় চরিত্র প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের ব্যাগের আকার আর ওজনটাও যখন ভারী হতে থাকলো, তখন শুটিং ইউনিটের মাইক্রো বাসেই যাতায়াত করতাম। ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে। নির্দিষ্ট কোন যায়গায় গিয়ে মাইক্রো বাসে ওঠা বা শুটিং শেষে গভীর রাতে নামিয়ে দেবার পর সেখান থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে এক সময় কাঁধের ব্যথাটা যখন স্থায়ী রূপ ধারণ করলো, তখনই সাহস করেছিলাম একটা গাড়ি কেনার।

২০০৭ সালে নিজ সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে, ভাইয়ের কাছ থেকে লোন, প্রডিউসারের কাছ থেকে আগাম সম্মানী আর ব্যাংকের লোন নিয়ে একটা গাড়ি কিনেছিলাম। তখন ঐ গাড়িটাই হয়ে গেল আমার অর্জিত সবচে বড় সম্পদ। শুধু আমার নয়, এর আগে আমার বৃহত্তর পরিবারেও কেউ গাড়ি কেনেনি বা সেই সামর্থ্য বা সাহস কারো হয়নি। প্রথম মাসে ড্রাইভারের বেতন দেবার সময় অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করেছিল আমার মধ্যে যে,আমার কষ্টের উপার্জনের টাকার বেতনে আরেকটা পরিবার চলবে সেদিন থেকে।

গ্রামের বাড়িতে নতুন গাড়ি নিয়ে যাওয়া, আর বাবা মাকে নতুন গাড়িতে ওঠানোর মুহূর্তটা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই গাড়িতে করেই জন্মের পর শুদ্ধকে  হাসপাতাল থেকে নিজে ড্রাইভ করে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। দীর্ঘ ১৬ বছর, গাড়িটা আমার পরিবারের সদস্য হয়ে থাকলো।

অনেক মায়া আর ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল এই জড় বস্তুটির প্রতি। মাঝে মধ্যে সে বিগড়ে যেত, অবাধ্য হতো….তারপর আবার যত্ন নিয়ে ওকে ঠিক করতাম। মাস ছয়েক আগে নতুন একটা গাড়ি যখন আমার পরিবারের নতুন সদস্য হলো, তখনই হয়তো ও বুঝতে পেরেছিল, ওকে আমরা ছেড়ে দেবো অন্য কারো কাছে। নানান অজুহাতে আমি ওকে এই ছয়মাস ছাড়িনি। সত্যি। আজ যখন ওকে বিদায় দিলাম, খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, শান্তার….শুদ্ধ’র চোখটাও ছল ছল করছিল। কাগজ পত্রের কাজ শেষ করে, ওর নতুন মালিকের। হাতে ওকে যখন বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম, আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না।

শুধু অনুরোধ করলাম, তাকে যেন একটু আদর যত্ন করে। ওকে নিয়ে যাবার পর, খালি গ্যারেজটাতে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, জীবের সঙ্গে জড়’র এই সম্পর্কটা আসলে কি? শুধুই মায়ার?? ভাবছিলাম, ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার যে কষ্ট হচ্ছে, ও কি সেটা বুঝতে পারছে???? হয়তো পারছে না,হয়তো পারছে…..কিন্তু আমরা তিনজন গেইটের রাস্তায় দাড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত ওর চলে যাওয়াটা দেখা যায়….।

ইত্তেফাক/বিএএফ