ঈদের বাজার ধরতে তাঁতমালিক-শ্রমিকরা এখন দিনরাত কাপড় তৈরিতে ব্যস্ত। তাই পাবনার তাঁতপল্লিগুলো তাঁতের শব্দে মুখর। লুঙ্গি-গামছার পাশাপাশি কাতান ও বেনারসি শাড়ির চাহিদা বেড়েছে।
তাঁতপ্রধান উপজেলা পাবনার সুজানগর, আটঘরিয়া, ঈশ্বরদী, বেড়া, সাঁথিয়ায় ঘুরে দেখা গেছে, কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের কোলাহলে সরব হয়ে উঠেছে তাঁতপল্লি। পুরুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নারীরাও নলিভরা, সুতাপারি করা, মাড় দেওয়া ও রং-তুলিতে নকশা আঁকাসহ কাপড় বুননিতে সহযোগিতা করছেন। এ অঞ্চলের তাঁতপল্লিতে উন্নতমানের জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, সুতি জামদানি, বেনারসি ও শেট শাড়ির পাশাপাশি মোটা শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রিপিস ও থান কাপড় তৈরি হচ্ছে। মানভেদে প্রতি পিস লুঙ্গি ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ঈশ্বরদীর ফতে মোহাম্মদপুর লোকোশেড এলাকার বেনারসি পল্লিতে তৈরি হচ্ছে বেনারসি, কাতান ও জড়ি-চুমকির শাড়ি। এসব শাড়ির চাহিদা রয়েছে দেশ জুড়ে।
তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাকালে দীর্ঘদিন রং-সুতার দাম চড়া থাকায় একের পর এক বন্ধ হচ্ছিল তাঁত। বাধ্য হয়ে অনেকে তাঁত বন্ধ করে বদলেছিলেন পেশা। করোনা-পরবর্তী সময়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন তাঁতিরা। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ায় এর চাহিদা ছিল কম। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সেই পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসের শুরু থেকেই তাঁতপণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ফলে এখন রাত-দিন কাজ করতে হচ্ছে তাঁতিদের।
নতুনপাড়া গ্রামের তাঁতি মতিন মিয়া বলেন, ‘এখানে বছর দুই আগেও হাজার তিনেক তাঁত চালু ছিল। এখনো অর্ধেকের বেশি তাঁত বন্ধ। আমিও দীর্ঘদিন তাঁত বন্ধ রেখেছিলাম। ঈদ উপলক্ষে টাকা ঋণ নিয়ে ১০টা তাঁত চালু করেছি। এখন যে লুঙ্গিগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর চাহিদা আছে বাজারে।’ আজিজুল হাকিম নামের এক তাঁতি জানান, তার ২৪টি তাঁতের মধ্যে ১২টি তাঁত পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ঈদ সামনে রেখে চাহিদা বাড়ায় আবার সেগুলো চালু করেছেন। রং-সুতার দাম যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে আবার তাঁতিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
বেড়া পৌর এলাকার বনগ্রামের তাঁত কারখানার মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাকালে কারখানার ২৪টি তাঁতের মধ্যে ১৫টিই বন্ধ করে রেখেছিলাম। কিন্তু করোনার সংকট কেটে গেলে তাঁতগুলোতে মান্ধাতা আমলের উৎপাদন কৌশল পরিবর্তন করে সেগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন শুরু করেছি। গ্রাফিক্স ডিজাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন নতুন নকশার শাড়ি-লুঙ্গি নিয়ে বাজারে হাজির হচ্ছি। এতে করে ভালো দামে শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি করতে পেরে আশার আলো দেখছি।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের ঈশ্বরদীতে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা খন্দকার ওবাইদুর রহমান জিলানী বলেন, করোনার ক্ষতি পোষাতে তাঁতিদের প্রণোদনা ও ঋণের ব্যবস্থা করায় সামনে দুটি ঈদ, দুর্গাপূজা ও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে তাঁতিদের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। পাবনা জেলা তাঁতি সমবায় সমিতির সভাপতি কামরুল আনান রিপন জানান, সরকার বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে তাঁতিদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে বন্ধ হওয়া তাঁতগুলো আবার সচল হবে।
