রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার প্রকৃতি পর্যায়ের গানে লিখিয়াছেন—‘নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা। /খেলো খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা।’ আমরা যেন কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া আমাদের প্রকৃতি জুড়িয়া দারুণ দহনবেলার নীরব ভৈরব খেলা দেখিতেছি। একদিকে তাপমাত্রা ৪০ হইতে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অন্যদিকে বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা যথেষ্ট মাত্রায় কম। সকল কিছু মিলাইয়া সমগ্র বাংলা যেন প্রখর সূর্যতাপে ঝাঁঝাঁ করিতেছে। প্রকৃতি যেন খেপিয়া গিয়াছে!
ইহা কি মানুষের কৃতকর্মের প্রতিফল? সমগ্র পৃথিবীতেই জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দিনের পর দিন স্পষ্ট হইতেছে। কেবল নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলিতেই নহে, শীতপ্রধান দেশগুলিতে জুন-জুলাইতে গত কয়েক বৎসর ধরিয়া এমন প্রচণ্ড দাবদাহ বহিতে দেখা গিয়াছে যে, ইহাকে প্রকৃতির প্রতিশোধ বলিতে চাহেন অনেকে। গত কয়েক বৎসর ধরিয়া গ্রীষ্মকালে ইউরোপের স্পেন হইতে ফ্রান্সের মধ্যে এমন কোনো জায়গা ছিল না, যেইখানকার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ছিল। পরিস্থিতি দেখিয়া ইউরোপের আবহাওয়াবিদ বলিয়াছেন, ‘ইহা যেন নরকের আগুন!’ তখন জার্মানি, স্পেন ছাড়াও অতিমাত্রায় শীতপ্রধান স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের দেশগুলিও গরমের আঁচ হইতে ছাড় পাইতেছে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমান্যুয়েল ম্যাক্রঁ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করিয়াছেন বিশ্বের উষ্ণায়নকেই। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণেই সাহারা আরো অধিক উষ্ণ হইতেছে এবং সাহারার লু হাওয়া ছড়ি ঘুরাইতেছে ইউরোপ জুড়িয়া। যেই কারণে প্যারিসে হাজারেরও অধিক ঝরনা লাগানো হইয়াছে। জার্মানির বহু জায়গায় প্রবল গরমে রাস্তার পিচ গলিতে শুরু করিয়াছে।
শীতপ্রধান দেশে জুন-জুলাইতে যাহা হয়, আমাদের এইখানে এপ্রিলের শেষ ও মে মাসে তাহার চাইতে অধিক ভয়াবহ অবস্থা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের একেবারে শুরুতেই এতখানি প্রচণ্ড গরম পড়িলে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর তাহার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়িতে বাধ্য। অর্থাৎ এই গরম আরো অধিক বিপজ্জনক। প্রবাদ আছে যে, নগর পুড়িলে দেবালয়ও সেই অগ্নি হইতে রক্ষা পায় না। উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র উপকূলবর্তী বিশ্বের অধিকাংশ ভূখণ্ডই প্রবল ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের অন্যতম প্রস্তুতকারী শিল্পসমৃদ্ধ দেশসমূহের বড় একটি অংশ ইউরোপেই রহিয়াছে। ইহা ঠিক যে, পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তন অবশ্য কোনো নূতন বিষয় নহে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখন অবধি পৃথিবী মোট ১৩ বার প্রায় ধ্বংসের সম্মুখীন হইয়াছে। প্রাণের মহাবিলোপ ঘটিয়াছে কমপক্ষে পাঁচ বার। প্রতিটি মহাবিলোপের পর পুনরায় ধীরে ধীরে জীববৈচিত্র্যে ভরিয়া উঠিয়াছে এই পৃথিবী। আর এই সকল ধ্বংসের ঘটনা ঘটিয়াছে প্রাকৃতিক কারণেই। তবে শিল্পবিপ্লবের পর হইতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেপথ্যে সরাসরি অবদান রাখিতেছে মানুষ। ইহা ঠিক যে, পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন কত ব্যাপক মাত্রায় হইতেছে, তাহা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট নহে। তবে পরিবর্তন যে ঘটিতেছে, তাহাতে কাহারও দ্বিমত নাই। মাত্র কয়েক বৎসর পূর্বে কুয়েতে সর্বকালের রেকর্ড ভাঙিয়া ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছুঁইয়া গিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, এই পৃথিবীতে দুর্যোগ কাহারো একার জন্য আসিবে না। একটিই ছাদ এই ধরিত্রীর। সুতরাং এই বিপদ হইতে রক্ষা পাইতে যাহা করণীয়, তাহা করিতে হইবে। নচেৎ নরকের আগুন ফি বৎসর আরো বেশি বেশি করিয়া উত্তাপ ছড়াইবে বিশ্ব জুড়িয়া।
