মানুষের সম্পত্তির লোভ মারাত্মক। এই লোভে পড়িয়া মানুষ খুনখারাবি করিতেও পিছপা হয় না। এই লোভ মানুষকে দিনদিন অন্ধ করিয়া দিতেছে। অনেক সময় ইহার শেষ পরিণাম কী হইবে তাহা চিন্তাও করিতেছে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা আমরা অনেকেই জানি। প্রথম দুই চরণেই বলা হইয়াছে, ‘শুধু বিঘে দুই ছিলো মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’ মানুষের কতটা জমি দরকার, সেই সম্পর্কে লিও টলস্টয়ের একটি সুন্দর গল্পও রহিয়াছে। তাহার পরেও জমিসংক্রান্ত লোভ আমরা সংবরণ করিতে পারিতেছি না। বিশেষ করিয়া, সরকারি সম্পত্তি যখন দখল করা হয় এবং অবৈধভাবে তাহার বেচাকেনা চলে, তখন সকল কিছু দেখিয়া আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। অথচ সরকারি জমিজমা লিজ লওয়া আর জমির মালিকানা যে এক নহে, তাহা আমরা অনেকে ভাবিতেই চাহি না। সমগ্র দেশে এই ধরনের বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। খাসজমি, রেলওয়ের জমি, অর্পিত সম্পত্তি ইত্যাদি লিজ লইয়া অনেকে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করিতেছে, যাহার বৈধতার কোনো ভিত্তি নাই। ইত্তেফাকে গতকাল একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, সিলেট-আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের শমশেরনগর স্টেশনের পার্শ্ববর্তী রেলের ভূমি অবৈধভাবে ক্রয়বিক্রয়ের হিড়িক পড়িয়া গিয়াছে। কৃষি বন্দোবস্ত লওয়া ভূমি কীভাবে বিক্রয় করা হয় এবং সেইখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা হয়? ইহা ছাড়া মৌলভীবাজার অঞ্চলের ১১টি স্টেশনে রেলের দুই পার্শ্বে কৃষিভূমিতে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইতেছে। রেলওয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া কি ইহা সম্ভব?
শুধু রেলের ভূমি নহে, কোয়ার্টারও ক্রয়বিক্রয় চলিতেছে বলিয়া জানা যায়। এমনকি একটি মহল রেলের জমি অবৈধভাবে ভাড়া ও প্লট বিক্রয় করিয়া কোটি কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে। সেই জমিতে উঠানো হইতেছে পাকা দেওয়ালও। সরকার একজনকে সরকারি জমি লিজ দিল, তাহা আবার ব্যাংক মর্টগেজ রাখিয়া ঋণ প্রদান করা হইতেছে। যাহারা এইভাবে সরকারি জমি গ্রহণ করেন, তাহাদের মনে রাখা উচিত, তাহারা জমির ভোগদখল করিতে থাকিলেও সরকারের যখন প্রয়োজন হইবে, তখন সকল কিছু ছাড়িয়া দিতে হইবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমগ্র দেশে রেলওয়ের মোট জমি রহিয়াছে প্রায় ৬২ হাজার একর। ইহার মধ্যে কাগজে কলমে দখলে রহিয়াছে ৫৮ হাজার ৬০৬ দশমিক ৫৭ একর। প্রায় ৩ হাজার ৬১৪ একর জমি বেদখলে। তবে অবৈধ দখলে থাকা জমির পরিমাণ আরো বহু গুণ অধিক। রেলওয়ের হিসাবমতে, সংস্থাটির মোট জমির মধ্যে ব্যবহৃত হইতেছে ৩০ হাজার ৭৬৮ দশমিক ৫১ একর। আরো ১৩ হাজার একরের অধিক জমি দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন প্রভাবশালীর নিকট ইজারা দেওয়া হইয়াছে। ইহার বাহিরে ১৮ হাজার একরের অধিক জমি অব্যবহৃত রহিয়াছে। এই অব্যবহৃত জমির অধিকাংশই বেদখলে। ইহার মধ্যে কৃষিজমির পরিমাণই অধিক। আর এই কৃষিজমিগুলি অনেক ক্ষেত্রে লিজ দেওয়া হইতেছে যাহা আবার একসময় আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্লটে পরিণত হইতেছে।
উল্লেখ্য, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে রেলওয়ের যেই সকল অব্যবহৃত জমি রহিয়াছে, সেইগুলির মূল্য যেহেতু অনেক অধিক, তাই তাহা ভূমিদস্যুদের লোলুপ দৃষ্টিতে রহিয়াছে। শহরের বাহিরে রেলওয়ের বিস্তীর্ণ কৃষি ও জলাভূমি রহিয়াছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হইতে পারে—এই বিবেচনায় এই সকল জমি জনগণের নিকট হইতে অধিগ্রহণ করিয়া রাখা হইয়াছে। তবে চাষি, কৃষক কিংবা গরিব মানুষের জমি অধিগ্রহণ করিয়া তাহা ফেলিয়া রাখা যেমন অনুচিত, তেমনি তাহা একশ্রেণির প্রভাবশালীকে ভোগ করিতে দেওয়া অন্যায় বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। রেলওয়ের উচিত, নিজ জমির একটি সুন্দর ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা। অবৈধ দখলদারদের হাত হইতে জমি উদ্ধার করা এবং বুঝিয়া-শুনিয়া লিজ দেওয়া। লিজদানকৃত জমি যাহাতে কেহ অন্য কাজে ব্যবহার করিতে না পারে সেইদিকে নজর দেওয়া। সর্বোপরি, রেলের এই সকল জমি যদি কাজেই না লাগে, তাহা হইলে তাহা মূল মালিকের নিকট ফিরাইয়া দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
